logo

৮০০ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ‘গোড়ার মসজিদ’

৮০০ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ‘গোড়ার মসজিদ’
গোড়ার মসজিদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঝিনাইদহ জেলার বারোবাজার দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। এই জনপদের বুকে প্রায় ৮০০ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুলতানি আমলের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা গোড়ার মসজিদ। প্রাচীন বারোবাজারের অসংখ্য প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে এখনও দৃশ্যমান কয়েকটি মসজিদের অন্যতম এটি। স্থানীয়দের মতে, সুলতানি যুগের শুরুতে ‘গোড়াই’ নামের এক দরবেশের নামানুসারেই মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছিল।

বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকে বাজার অতিক্রম করে কয়েকটি দোকান ও বসতবাড়ির পর রাস্তার দক্ষিণ পাশে দেখা মেলে এই ঐতিহাসিক মসজিদের। জীর্ণতা সত্ত্বেও স্থাপনাটি আজও অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

প্রাচীন দিঘি, ইটের ধ্বংসস্তূপ এবং প্রত্নচিহ্ন দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে বারোবাজার একসময় হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসকদের সমৃদ্ধ রাজধানী ছিল। নগরীর দক্ষিণে প্রবাহিত ভৈরব নদ তখন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের ফলে বারোবাজার তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশ-বিদেশের সওদাগররা নৌপথে পণ্য নিয়ে এখানে আসতেন। এভাবেই যুগে যুগে বারোবাজার গড়ে ওঠে এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে।

গোড়ার মসজিদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
গোড়ার মসজিদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

লোকমুখে প্রচলিত আছে, সুলতান মোহাম্মদ শাহের শাসনামলে খান-ই-জাহান প্রথম বারোবাজারে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় সংঘটিত যুদ্ধে বহু সৈন্য হতাহত হন। ১৮৮৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এলাকার বিভিন্ন টিলা থেকে প্রাচীন ইটের স্থাপনা, নরকঙ্কাল, মসজিদসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন উদ্ধার করা হয়। তবে সংরক্ষণের অভাবে এসবের অনেকাংশই আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বর্গাকার পরিকল্পনায় নির্মিত গোড়ার মসজিদের বাইরের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ ফুট এবং ভেতরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ ফুট। প্রায় ৫ ফুট পুরু দেয়ালের চার কোণে রয়েছে আট কোনা আকৃতির চারটি মনোরম মিনার। পূর্ব দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অপেক্ষাকৃত বড়। মেহরাবগুলোতে পোড়ামাটির ফলকে ফুল, লতা ও নান্দনিক অলংকরণের নিদর্শন এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

মসজিদের অভ্যন্তরে চার দেয়ালের মধ্যবর্তীস্থানে রয়েছে চারটি পাথরের স্তম্ভ, যার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র গম্বুজটি। বাইরের দেয়াল এবং চার কোণের মিনারগুলোতেও পোড়ামাটির কারুকার্যের চিহ্ন রয়েছে। সময়ের ক্ষয়ক্ষতি রোধে কিছু অংশ সংস্কার করা হলেও মূল স্থাপত্যের সৌন্দর্য এখনও অটুট রয়েছে।

মসজিদের চারপাশের বেষ্টনী প্রাচীর অনেকাংশে ভেঙে পড়েছে। তবুও প্রতিদিন এখানে মুসল্লিদের নামাজ আদায় অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার শিরনি ও মানতকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু এখানে সমবেত হন। মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি বড় পুকুর, যা স্থানীয়ভাবে গোড়ার পুকুর নামে পরিচিত।

মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান রঞ্জু জানান, মসজিদের মূল স্থাপত্য এখনও অনেকটাই অক্ষত থাকলেও চারপাশের অবকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, মসজিদের দানবাক্সে প্রাপ্ত অর্থ স্থানীয় মাদ্রাসা ও এতিমখানার উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। সেখানে এতিম শিশুদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বারোবাজার এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এজন্য তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আট শতকের ইতিহাস, সুলতানি স্থাপত্যশৈলী, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং স্থানীয় মানুষের আবেগ, সবকিছুর সমন্বয়ে গোড়ার মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়; বরং বারোবাজারের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের এক জীবন্ত স্মারক। এর যথাযথ সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করবে।