logo

লবণ আমদানির অনুমতিতে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

• দেড় লাখ টন আমদানির অনুমতি

• পাইকারিতে দাম কমার শঙ্কা

• মজুত লবণের ন্যায্যমূল্য নিয়ে সংশয়

• ডিসেম্বরে উঠবে নতুন লবণ

লোকমান হাকিম
কক্সবাজার
লবণ আমদানির অনুমতিতে দুশ্চিন্তায় চাষিরা
লবণ হাতে মাঠে বসে আছেন এক চাষি। কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফদলণ্ডীর লবণ মাঠে। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মৌসুম শুরু হওয়ার আগে অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। আমদানির অনুমতি দেওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম কমে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। মজুত রাখা লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সংশয়।

গত মৌসুমে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার লেমশীখালীর হাজারিয়াপাড়ায় ছয় কানি (দুই একরের বেশি) জমিতে লবণ চাষ করেছিলেন নুর মোহাম্মদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রতি বছর ধারদেনা ও ঋণ নিয়ে মাঠে নামি। উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাই না। সব কিছুর দাম বেড়েছে। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি হলে চাষিরা না খেয়ে মরবে।

এই চাষি চলতি মৌসুমের শুরুতে দাম কম পাওয়ায় লবণ মজুত করে রেখেছিলেন। চাষে তার খরচ হয়েছিল প্রায় ছয় লাখ টাকা। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও উৎপাদন হয় এক হাজার ৪০০ মণ লবণ। মৌসুমের শুরুতে দাম কম থাকায় ৬০০ মণ বিক্রি করেন তিনি। ৮০০ মণ লবণ মজুত রাখেন গর্তে। আশা ছিল, দাম বাড়লে বিক্রি করবেন।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কথা হলে নুর মোহাম্মদ হতাশ কণ্ঠে বলেছিলেন, প্রতি কানি জমির লাগিয়ত বাবদ ৪০ হাজার টাকা, পলিথিনে ছয় হাজার এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ লবণের দাম ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকা। পরে তা ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে ৩৮০ থেকে ৩৯০ টাকা দরে বিক্রি হলেও দালালরা প্রায় ৬০ টাকা খরচ কেটে নেয়। চাষিরা পান প্রায় ৩২০ টাকা।

কক্সবাজার লবণ চাষি সমিতির তথ্যানুযায়ী, গত মৌসুমে কক্সবাজারে প্রায় ৪২ হাজার চাষি লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশের মোট লবণের প্রায় ৮৭ শতাংশ কক্সবাজারে উৎপাদিত হয়। গত মৌসুমে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মোট ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছিল।

চাষি নুর মোহাম্মদের মতো দুশ্চিন্তার কথা বলছেন লেমশীখালীর লবণ ব্যবসায়ী আবদুর রহিম। তিনি বলেন, মাঠে পর্যাপ্ত লবণ মজুত থাকা সত্ত্বেও আমদানি করলে প্রান্তিক চাষিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মাঠে যে পরিমাণ লবণ আছে, সরকার প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তা বের করুক।

অমদানির অনুমতি, মজুতের তথ্য

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশেনের (বিসিক) তথ্যানুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশে পরিশোধিত লবণের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণ সাড়ে সাত লাখ টন, শিল্পে ব্যবহারের জন্য সাড়ে নয় লাখ টন, মাছ চাষে ৩৭ হাজার টন এবং প্রাণিসম্পদ খাতে তিন লাখ ছয় হাজার টন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর নিবন্ধিত ও চালু মিলের অনুকূলে এ আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে। প্রায় ২৫১টি প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আমদানির আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

অনুমতি অনুযায়ী, ২৪৪টি মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনকারী সাত প্রতিষ্ঠানকে ২ হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২৪৪টি মিলের মধ্যে ৮৬টি গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত কোনো ভোজ্য লবণ উৎপাদন করেনি।

বিসিকের তথ্য বলছে, বর্তমানে মাঠে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মৌসুমের উৎপাদিত লবণ বাজারে আসবে।

স্থানীয় বাজারে চাপ তৈরির শঙ্কা

লবণ চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাঠে থাকা লবণের বড় অংশ এখনও চাষিরা গর্তে মজুত রেখেছেন। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এত দিন অনেক চাষি তা বাজারজাত করতে পারেননি। এ সময়ে আমদানি হলে স্থানীয় লবণের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।

কুতুবদিয়ার লেমশীখালীর লবণ ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, মাঠে পর্যাপ্ত লবণ মজুত আছে। দেশে বর্তমানে লবণ আমদানির প্রয়োজন নেই। মাঠে কী পরিমাণ লবণ রয়েছে, প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করা যেতে পারে। আমদানি করা হলে প্রান্তিক চাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ঈদগাঁওয়ের গোমাতলী এলাকার লবণ ব্যবসায়ী সাইফুদ্দিন বলেন, একজন চাষি সাধারণত অন্তত তিন কানি (এক একরের বেশি) জমিতে লবণ চাষ করেন। এতে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়। স্বাভাবিক মৌসুমে ওই জমিতে প্রায় ৬০০ মণ লবণ উৎপাদন হয়। বর্তমান বাজারদরে সেই লবণ বিক্রি করে খরচের তুলনায় খুব বেশি লাভ থাকে না। এ অবস্থায় আমদানির অনুমতি বহাল থাকলে প্রান্তিক চাষিরা আগামী মৌসুমে মাঠে নামতে আগ্রহ হারাবেন।

ঈদগাঁওয়ের ইসলাপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মৌসুমের লবণ বাজারে আসবে। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে দেশে আনতে ও বাজারজাত করতে সময় লাগবে। তাই বর্তমানে মজুত লবণ দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব কি না, সেটি আগে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিসিকের ‘অজুহাত’ মানতে নারাজ ব্যবসায়ীরা

বিসিক দাবি করেছে, গত মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে লবণের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছিল। বর্তমান মজুত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে পারে। এর আগে নতুন মৌসুমের লবণ বাজারে আসার কথা থাকলেও গত বছর মৌসুমের প্রথম দুই মাসে উৎপাদন খুব কম হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সম্ভাব্য ২০ থেকে ২৫ দিনের সংকট মোকাবিলায় আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী খোকন মিয়া বলেন, মাঠে এখনো পর্যাপ্ত লবণ মজুত আছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চাষিরা এতদিন অনেক লবণ বিক্রি করতে পারেননি। চলতি মাসের শেষ দিকে এসব লবণ বাজারে আসতে শুরু করবে। এর মধ্যেই আমদানি করা হলে স্থানীয় লবণের দাম কমে যেতে পারে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।

কক্সবাজার লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী মাঠে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

আমদানি অনুমতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমদানি অনুমতি প্রদান সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র আমি হাতে পাইনি।প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গত মৌসুমটি চাষিদের জন্য খারাপ গেছে। আগামী মৌসুমের জন্য অক্টোবরের শেষ দিকে চাষিরা মাঠে নামবেন।