এমপির উপস্থিতিতে খাসজমি উদ্ধারে লুটপাট, নেপথ্যে যুবদল নেতার চাঁদা দাবি

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা ঘের দখলমুক্ত করতে অভিযানের সময় লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের উপস্থিতিতেই এ ঘটনা ঘটে। প্রশাসনিক এই অভিযানের সময় ঘেরের স্থাপনায় আগুন ও মাছের খাদ্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় খামারির কাছে চাঁদা না পেয়ে তার গরু-ছাগল ও হাঁস নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতা ও তার সমর্থকের বিরুদ্ধে।
ঘেরমালিকদের দাবি, গত ২১ অক্টোবর থেকে চাঁদপুরের মখদ্দি ও আশপাশের চরাঞ্চলে চালানো অভিযানে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাঁধ কেটে দেওয়ার পর কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে, লুট হয়েছে। একই সঙ্গে ঘেরের বিভিন্ন স্থাপনা, মাছের খাদ্য ও চাষের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরমালিকদের একজন ইকবাল মিয়া। ফেরিঘাটের পাশে মখদ্দি এলাকায় প্রায় ৫৮ একর জমিতে একাধিক মাছের ঘের গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তার দাবি, ঘেরগুলো গড়ে তুলতে প্রায় ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর থেকে ইব্রাহিমপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর মাঝি বিভিন্ন দফায় তার কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। সবশেষ অভিযানের সময় এমপির কথা বলে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। এ সময় তাকে ১০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। কিন্তু এতে সন্তুষ্ট না হয়ে অভিযান শেষে সবাই চলে যাওয়ার পর জাহাঙ্গীর তার লোকজন নিয়ে ঘেরে হামলা চালান। এ সময় বাঁধ কেটে দেওয়ায় ঘেরের সব মাছ বের হয়ে যায়। একই সময়ে তার ২৭টি গরু, ৭১টি ছাগল ও ৩০০টি হাঁস লুট হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ইকবাল মিয়া আরও বলেন, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগে ঘেরগুলো করেছি। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেছে। বাঁধ কেটে দেওয়ার পর মাছ লুট হয়ে গেছে। গরু-ছাগলও নিয়ে গেছে। এখন আমি নিঃস্ব।
অভিযোগ অস্বীকার করে যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর মাঝি বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। ওর কাছ থেকে ৩৫ লাখ কেন, ৩৫ টাকাও আমি নিইনি। অভিযানের সময় সবার সামনেই প্রশাসনের লোক ইকবালের ঘের কেটেছে। আর তার ঘেরে কোনো গরু-ছাগল কিছুই ছিল না।
এদিকে অভিযানের সময় ঘেরের স্থাপনা ও মাছের খাদ্যে আগুন দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মাহফুজ মিয়াও। তার দাবি, নিজের চোখের সামনে তিলে তিলে গড়ে তোলা স্থাপনা ও মাছের খাদ্য পুড়ে যেতে দেখেছেন তিনি। তবে ভয়ে তখন ঘটনাস্থলের সামনে যাওয়ার সাহস পাননি।
মাহফুজ মিয়া বলেন, চোখের সামনে আমার সবকিছু পুড়ে যেতে দেখেছি। আগুনে মাছের খাদ্য ও স্থাপনা পুড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন ছিল যে ভয়ে সামনে যাওয়ার সাহস পাইনি।

ঘেরমালিকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের নোটিশ না দিয়েই অভিযান চালানো হয়েছে। হঠাৎ করে ঘের উচ্ছেদ করায় মাছ ও অন্যান্য সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি তারা। ফলে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগে গড়ে তোলা এসব ঘেরের স্থাপনা, মাছের খাদ্য ও চাষের উপকরণ নষ্ট হওয়ায় তাদের বিপুল লোকসান হয়েছে। এতে প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ঘেরমালিকদের।
ঘেরমালিক মমিন দিদার বলেন, গত ২১ অক্টোবর থেকে আমাদের কোনো ধরনের নোটিশ না দিয়ে চাঁদপুর-৩ আসনের এমপি ভেকু দিয়ে আমাদের ঘেরের বাঁধগুলো কেটে দিয়েছেন। এতে ঘেরের মাছগুলো লুটপাট হয়েছে। এ ছাড়া ঘেরের গুদামঘরগুলোতে আগুন দিয়ে মাছের খাবার নষ্ট করেছেন। আমাদের প্রায় শতকোটি টাকার লোকসান হয়েছে। এখন আমি নিঃস্ব। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এসে পরিস্থিতি দেখলাম। এ সম্পর্কে ডকুমেন্টস দেখে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব।
চাঁদপুরের প্রশাসন শরীয়তপুরে কেন অভিযান পরিচালনা করেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সীমানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে, একাধিক মামলাও রয়েছে। তাই সীমানা নিয়ে ঘটনাস্থলে কিছু বলা যাচ্ছে না।
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এন এম জামিউল হিকমা বলেন, তারা আমাদের জানিয়ে বা অনুমতি নিয়ে সরকারি জমি দখল করে ঘের নির্মাণ করেনি। তাই সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করায় তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।

লুটপাটের বিষয়ে তিনি জানান, এসব উপজেলা প্রশাসন করেনি। স্থানীয় জনগণের জমি যারা চাষাবাদ করতেন, জোর করে দখল করে রাখায় তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এসব ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তিনি বলেন, যারা যারা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে বলেছি। আর শরীয়তপুরের অংশ যদি পড়ে থাকে, তাহলে ডিসি টু ডিসি কথা বলবে। সেখানে আইনের যে বিধান রয়েছে, সে বিধি মোতাবেক তারা কাজ করবে।
