দিনাজপুরে শিলাবৃষ্টিতে ৪ হাজার ৯৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত

দিনাজপুরের চারটি উপজেলায় ঘণ্টাব্যাপী চলা ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধান, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, আম ও লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কেবল মাঠের ফসলই নয়, বিধ্বস্ত হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার চারটি উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ৯৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসল ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের জমি জায়গার কাগজপত্র জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে মাঠে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করা উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে ছুটছেন। কৃষকদের সুবিধার জন্য কর্মকর্তা কর্মচারীরা পাড়ায় পাড়ায় টেবিল চেয়ার নিয়ে বসেছেন।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টি চলে ঘণ্টাব্যাপী। এতে বোরো ধান পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, কলা আম, লিচু কাঁঠালসহ মৌসুমি ফসল ও ফলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা যায়, সদর, ফুলবাড়ী, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর এই চারটি উপজেলার উপর দিয়ে কালবৈশাখীসহ শিলাবৃষ্টি বয়ে যায়। এতে চার উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৯৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ফুলবাড়ী উপজেলার ১নং এলুয়াড়ি ইউনিয়নের সহড়া, পুটকিয়া, নবগ্রাম, খাজাপুর, জোয়ার, জগন্নাথপুর, বানাহার, উষাহার, পানিকাটা, উত্তর শিবপুর, এলুয়াড়ি গ্রামের ফসল পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামের বাড়ি ঘরের অবস্থা ভয়াবহ। কোনো বাড়ির টিন ব্যবহারের উপযুক্ত মনেই। ঘরের ভেতর থেকে পুরোপুরি আকাশ দেখা যাচ্ছে। ধান ও ভুট্টার গাছের মাথাগুলো গুঁড়িয়ে গেছে। তাল ও নারকেল গাছের পাতা গুলো ঝিরঝির হয়ে গেছে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, তিনি গতকাল এবং আজকে সারাদিন ধরে মাঠে রয়েছেন। কৃষি অফিসের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা মাঠে কাজ করছেন। প্রাথমিকভাবে চার উপজেলায় ৪ হাজার ৯৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে। তিনি যেসব জমির ধান, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। সে সব জমিতে আগাম জাতের আউশ রোপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কৃষকদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে কার কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার তালিকা তৈরি করছেন। চার উপজেলায় ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৩৬৮ হেক্টর, ফুলবাড়ী উপজেলার একটি ইউনিয়নে ১ হাজার ৫২৮.৫ হেক্টর, চিরিরবন্দর উপজেলায় ৫ হেক্টর ও পার্বতীপুর উপজেলায় সাড়ে ৯ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে মোট ৬ হাজার ৩১৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা যায়, সদর, ফুলবাড়ী, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর উপজেলায় শিলাবৃষ্টির তীব্রতা ছিল স্মরণ কালের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। শতশত ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের টিনের চালা নষ্ট হয়েছে। ফুলবাড়ী এলুয়ারী ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ি ঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের টিনের চালা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
জেলা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান জানান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) কাছে নিরূপণে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে দিনাজপুরের এই ক্ষয়ক্ষতির কথা মন্ত্রণালয়ে জানিয়ে ফ্যাক্সবার্তা পাঠানো হয়েছে।
ফুলবাড়ী উপজেলার এলুযারী ইউনিয়নের সোলায়মান, সোহরাফ, বাবুল, আবু হায়াত, আলমগীর, শতশত কৃষক জানিয়েছেন, তাদের ফসল বাড়ি ঘরের টিন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তারা ঋণ নিয়ে এনজিও থেকে কিস্তি তুলে এই ফসল লাগিয়েছিলেন। তাদের বাড়ি ঘরের টীন গুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারা কি বাবে এই ক্ষতি পুষাবেন তা নিয়ে চিন্তিত।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম মঙ্গলবার রাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ঘরের টিনের ছবি পোষ্ট করে ফেসবুকে লিখেছেন, আজ ফুলবাড়ী উপজেলার এলুয়াড়ি ইউনিয়নের ৮-৯টি গ্রামে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি ও ঝড় হয়েছে। আম, লিচু ও ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘরের টিন ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। গাছের পাতা এভাবে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে ঝরে যায় তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। চারটি গ্রামের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আল্লাহ তায়ালা এসব মানুষের সহায় হোন।