logo

রাঙামাটি/সবুজ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময় ধুপপানি ঝরনা

সবুজ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময় ধুপপানি ঝরনা
রাঙামাটির বিলাইছড়ির দুর্গম ধুপপানি ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন পর্যটকেরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঝরনাগুলো যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। রাঙামাটির পরিচিত সুবলং ঝরনার বাইরেও পাহাড়ি এই জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক মনোহর জলপ্রপাত।

তবে প্রচারের অভাব আর দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে এর অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে। এর মধ্যে বিলাইছড়ির দুর্গম পাহাড় ও সবুজের বুক চিরে বয়ে চলা ‘ধুপপানি’ ঝরনা এক অপরূপ প্রাকৃতিক সৃষ্টি। জলপ্রপাতের কলতান আর মেঘ-জলের মিতালী উপভোগ করতে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে ছুটে যান রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকরা।

রাঙামাটি শহর থেকে বিলাইছড়ি উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। বিলাইছড়ি থেকে ইঞ্জিনচালিত বোট বা স্পিডবোটে দুই ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় দুর্গম ফারুয়ার উলুছড়ি গ্রামে। নদীপথ শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় পাহাড়ে চড়ার আসল রোমাঞ্চ। উলুছড়ি থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পাহাড়ি হাঁটা পথ কখনো সমতল, আবার কখনো খাড়া পাহাড় ডিঙিয়ে এগিয়ে চলে।

স্থানীয়দের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা আর নিবিড় প্রকৃতি দেখতে দেখতে ঘণ্টার দুয়েকের মধ্যেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুপপানি ঝরনা। স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘ধুপ’ শব্দের অর্থ সাদা। জনশ্রুতি আছে, এই ঝর্নার ঠিক ওপরেই ধ্যানরত রয়েছেন এক সাধু। পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে ঝরনার ভেতরের গুহায় ঢোকার এক আশ্চর্যজনক অভিজ্ঞতা মেলে এখানে, যার শীতল জলধারায় মুহূর্তেই ধুয়ে যায় পথচলার সব ক্লান্তি।

বিলাইছড়ির পাহাড়ি গহীনে বয়ে চলা ধুপপানি ঝরনা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বিলাইছড়ির পাহাড়ি গহীনে বয়ে চলা ধুপপানি ঝরনা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মো. মাহিম রানা বলেন, উলুছড়ি থেকে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল আর পারব না। তবে সবাই একসঙ্গে আসায় সাহস নিয়ে এগিয়ে চলি। ঝর্নায় পৌঁছানোর পর এর রূপ আর শীতল জলে গা ভিজিয়ে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। যতক্ষণ ছিলাম সময় কীভাবে কেটে গেছে বলতে পারব না।

আরেক পর্যটক মো. সাইফুল ইসলাম নুর বলেন, অনেক দিন ধরে আসব আসব করেও আসতে পারিনি। শেষে একটি ট্রাভেল টিমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এলাম। এখানে না আসলে এর রূপ-সৌন্দর্য কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। আসার পথটি কঠিন ছিল, তবে পৌঁছানোর পর সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।

বর্তমানে স্থানীয় অনেকেই বর্ষাকালে পর্যটক গাইড হিসেবে কাজ করে ভালো আয় করছেন।

স্থানীয় গাইড মিলন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, এখানে আমরা ২০-২২ জন গাইড আছি। বর্ষায় প্রচুর পর্যটক আসেন। তাদের নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাইড হিসেবে আমরা কাজ করি। উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক পর্যটক আমাদের নির্দেশনা মানেন না, যার ফলে মাঝে মাঝে দুর্ঘটনা ঘটে। তাই আমরা পর্যটকদের সব সময় আমাদের গাইডলাইন মেনে চলতে বলি। পর্যটক আসায় আমাদের আয় বেড়েছে, আর বাকি সময়টা জুম চাষ করে আমাদের সংসার চলে।

বিলাইছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর উত্তম তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফারুয়া পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ সহজ করা গেলে পর্যটকরা খুব সহজেই গাড়ি ও গাইড নিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন। এতে এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও ঝরনাগুলোর সৌন্দর্য রক্ষা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্যা দূর করতে বিশেষ উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হলে সারাবছর পর্যটকদের সমাগম ধরে রাখা যাবে। শুধু ধুপপানি ঝরনা নয়, এমন আরও অনেক দুর্গম ঝরনা রয়েছে, যেগুলো সহজগম্য করতে কাজ করা হবে।