logo

টাকা চুরির অভিযোগে মেস কর্মচারীকে ডিবি পুলিশের নির্যাতন

টাকা চুরির অভিযোগে মেস কর্মচারীকে ডিবি পুলিশের নির্যাতন

পিরোজপুর ডিবি পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসে অস্থায়ী কেয়ারটেকার হিসেবে কর্মরত মো. ইউনুস ফকির (৪০)। ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলামের টাকা চুরির অভিযোগে তাকে নির্যাতন করা হয়। তবে পরে অন্য এক কর্মীর কাছ থেকে চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধার করা হয়।

গত ১৩ এপ্রিল দুপুরে নির্যাতনের এ ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত বৃহস্পতিবার রাতে।
 

পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের মৃত মোবারেক আলী ফকিরের ছেলে ইউনুস জানান, পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের রাস্তায় প্রবেশের মুখে পুলিশ কর্মকর্তাদের থাকার জন্য নির্মিত মেসে সে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছে। ২০০৮ সালে ভবনটি নির্মাণের সময় সে ওখানে যুক্ত হয়। পরে মেসে অবস্থানকারীরা প্রতি মাসে তাকে কিছু টাকা দেন। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে থাকেন পিরোজপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম। তার কক্ষের দুটি চাবির মধ্যে একটি ইউনুসের কাছে ছিল। 

সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুর দেড়টার দিকে আরিফ হঠাৎ করেই ইউনুসের কাছে থাকা চাবিটি ফেরত চায়। তবে সেটি দিতে ব্যর্থ হয় ইউনুস। এরপরই আরিফ তাকে জানায় যে, তার কক্ষ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং ইউনুসই সেই টাকা নিয়েছে। 

তাই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করে। ইউনুস টাকা চুরির কথা অস্বীকার করার পর তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ভবনের নিচতলায় নিয়ে যায় এবং তাকে মারধর শুরু করে। পরে ডিবি পুলিশের আরও ৭-৮ সদস্য সেখানে গিয়ে ইউনুসকে নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। এমনকি বৈদ্যুতিক শক দেয়। এ ছাড়া সে চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি দিয়ে শব্দ বন্ধ করে রাখে। পরবর্তী সময়ে ইউনুস জানান, যেহেতু তার কাছে একটি চাবি ছিল সে ওই টাকা পরিশোধ করবে। 

 ডিবি পুলিশের লোকজন তাকে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। তখন পরিবারের সদস্যরা টাকাগুলো দেওয়ার জন্য রাত পর্যন্ত সময় দাবি করে। এরপর মেসে নিয়ে আবারও ইউনুসকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে আরিফের ঘনিষ্ঠ ডিবি পুলিশ সদস্য কাওসারের নেতৃত্বে ৩-৪ জন তাকে জোর করে রান্নাঘরে নিয়ে যায়। এরপর তার বিশেষ অঙ্গে মোমবাতি গলিয়ে আধাঘণ্টা ফেলতে থাকে। এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা আরিফকে টাকাগুলো পৌঁছে দেয়। পরবর্তীতে ইউনুসকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীর কাছে নিয়ে যায়। 

এরপর তিনি ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর ওই মেসে কাজ করা ঝাড়ুদার শাকিলকে ডেকে পাঠান। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। এরপর ইউনুস প্রথমে যে টাকা দিয়েছিল সেগুলো তাকে ফেরত দেওয়া হয়।  তবে পরবর্তীতে সে চিকিৎসার জন্য পিরোজপুর সদর হাসপাতালে যেতে চাইলে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তাকে পিরোজপুর শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা করান। 

তবে বিষয়টি জানাজানি হবে এই আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছে ইউনুসের সমস্যার বিষয়ে কিছুই বলতে দেয়নি হুমায়ুন। 

এরপর একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে পরের দিন ডিবি পুলিশ ইউনুসকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সেখানেও ইউনুসকে বলতে বাধ্য করে যে, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে সে নিজেই নিজের বিশেষ অঙ্গ পুড়িয়েছে। এ ছাড়া সে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। 

তবে এ ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে ইউনুস। এ ছাড়া পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবে না এই আশঙ্কায় তারা কোথাও কোনো অভিযোগ দেয়নি। 

তবে বিষয়টির সুষ্ঠু বিচারের জন্য পুলিশ সুপার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান ইউনুস। এ ছাড়া তাকে একটি কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান নয়, নির্মম এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে ইউনুস ও তার পরিবার।  

ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, একজন খুনিকেও এভাবে নির্যাতন করা হয় না, যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। তাই তিনিও এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। 

তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি ছুটিতে আছে বলে জানান এবং এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বরং তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। 

পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে পরিদর্শনকালে শনিবার (১৮ এপ্রিল) পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল আউয়াল বলেন, ভুক্তভোগী এখনও লিখিত অভিযোগ দেয়নি। ভুক্তভোগী যাতে আশঙ্কা মুক্ত থাকে সে জন্য আমাদের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে, তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।