চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যায় কৃষিতে দুই কোটি ৯১ লাখ টাকার ক্ষতি

উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বন্যায় কৃষির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এবারের বন্যায় বিভিন্ন ফসলের আনুমানিক দুই কোটি ৯০ লাখ ৭৬ হাজার ৪০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার মোট ৬৪৬ জন কৃষক সরাসরি লোকসানের মুখে পড়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্যায় মোট ২১৩ দশমিক ৪০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যার মধ্যে ৩৭ দশমিক চার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ এবং ৫৩ হেক্টর জমির ফসল আংশিক নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় ৬২৯ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
নষ্ট হওয়া ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন শাকসবজি চাষিরা। শাকসবজিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬৮ দমমিক ৯৬ লাখ টাকা। কলায় ৪৫ দশমিক ৪০ লাখ, হলুদে ২৫ লাখ, মাসকলাইয়ে ১৬ দশমিক ৮০ লাখ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে ১২ দশমিক ৮৬ লাখ, পেঁপেতে ১১ দশমিক ৫০ লাখ, মরিচে ছয় লাখ, আমন ধানে দুই দশমিক ৯০ লাখ এবং আউশ ধানে এক দশমিক ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীগুলোর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। ওই সময়ে পদ্মা নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হাওয়ার পাশাপাশি জেলার মহানন্দায় ও পুনর্ভবাতেও আশঙ্কাজনক হারে পানি বৃদ্ধি পায়। এতে করে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়।
উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শিবগঞ্জে; সেখানে ২৪৩ দশমিক ৬৮ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৫১৬ জন কৃষক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৪২ দশমিক ৫ লাখ টাকা (৯০ জন কৃষক) এবং গোমস্তাপুরে পাঁচ লাখ টাকার (৪০ জন কৃষক) ক্ষতি রেকর্ড করা হয়।
বন্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের শাহজাহানপুর, চরঅনুপনগর, নারায়নপুর, চরবাগডাঙ্গা, আলাতুলি, সুন্দরপুর, ইসলামপুর, দেবীনগর ও রানীহাটি; শিবগঞ্জের দুর্লভপুর, মনাকষা, পাঁকা, ছত্রাজিতপুর, উজিরপুর, ঘোড়াপাখিয়া ও শ্যামপুর এবং গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। এনজিওর ঋণ ও চড়া সুদে টাকা ধার করে চাষ করা ফসল হারিয়ে এখন চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন এলাকার চাষিরা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আর টাকা ধার করে জমিতে সবজি আর কলার চাষ করেছিলাম। আশা ছিল ফসল বিক্রি করে সংসারের খরচ চালিয়ে দেনা শোধ করব। উজান থেকে আসা হঠাৎ বন্যার পানিতে চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল।
তিনি আরও বলেন, এখন পরিবারের খাবার জোটানো, ঋণের কিস্তি দেওয়া নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। সরকার যদি আমাদের দ্রুত বীজ ও সার দিয়ে সাহায্য না করে, তবে সামনের মৌসুমে আবার চাষ শুরু করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
একই উপজেলারই দুর্লভপুরের বাসিন্দা আরজেদ আলী বলেন, সবচেয়ে বেশি টাকা ঢেলেছিলাম সবজিতে। সার, বীজ ও মজুরি মিলিয়ে প্রতি বিঘাতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। পানি এত দ্রুত ঢুকেছে যে মাঠ থেকে কোনো ফসল তোলার সুযোগ পাইনি। পানিতে ডুবে সব পচে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা তো কোনো ব্যবসা বুঝি না, এই মাটিই আমাদের একমাত্র সম্বল। এত বড় ক্ষতি আমরা কীভাবে সামাল দেব বুঝতে পারছি না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলির বাসিন্দা সানাউল্লাহ বলেন, বন্যার পানি আমাদের সব আশা-ভরসা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন মাঠে নতুন করে ফসল ফলার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না, অন্তত বিনামূল্যে আবার বীজ আর সার দিলে কষ্ট করে হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারব। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে আমাদের না খেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদ-নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিচু এলাকার ফসলি জমিগুলো প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে শাকসবজি ও কলারসহ আরও কিছু ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মাঠপর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা ও প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে প্রণোদনা, বিনামূল্যে বীজ ও সার বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে, যাতে তারা পরবর্তী মৌসুমে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন। একই সঙ্গে বন্যাপরবর্তী পরিস্থিতিতে যেকোনো ফসলের রোগবালাই রোধ ও মাঠ ব্যবস্থাপনায় কৃষি বিভাগ সার্বক্ষণিক কৃষকদের পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
