logo

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচ, দুশ্চিন্তায় কৃষক

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচ, দুশ্চিন্তায় কৃষক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি এসে পড়েছে দেশের কৃষি খাতে। তারই ধারাবাহিকতায় জামালপুরের প্রান্তিক কৃষকরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। জেলার শহর থেকে উপজেলা প্রায় সব জায়গার পাম্প ঘুরেও মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল। এর মধ্যে আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচ, যা নতুন করে চাপ তৈরি করেছে কৃষকদের ওপর। তবে তেলের দাম বাড়লেও কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি না হওয়ার জন্য পরামর্শ এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে কৃষিপণ্যের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। 

মেলান্দহ উপজেলার ৫ নম্বর চরের কৃষক শফিকুল ইসলাম এবার পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। সেচের জন্য তার ভরসা ডিজেলচালিত পাম্প। কিন্তু গত দুই মাস ধরে তেলের সংকট আর এখন বাড়তি দামের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা তো সাধারণ কৃষক মানুষ, এই অবস্থায় পড়ে খুব কষ্টে আছি। এ বছর শুরু থেকেই খরচ বাড়তেই আছে। তাও ঠিকমতো ক্ষেতে পানি দেবার পাইতাছি না । ডিজেলের দাম বাড়ায় আমরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছি। আগে যেখানে সেচ দিতে খরচ কম লাগতো, এখন একই জমিতে পানি দিতে অনেক বেশি টাকা লাগছে। তার ওপর আবার ঠিকমতো তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। 

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও। এমনিতেই সার-বীজসহ কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই জনপদের কৃষকদের। তার ওপর ডিজেলের দাম বেড়ে এক লাফে হয়েছে ১১৫ টাকা। এতে সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষিতে-বাড়বে উৎপাদন খরচ, লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তাই কৃষকদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনার দাবি তাদের।

কৃষক নাহিদ হাসান বলেন, চাষাবাদ করতে খরচ বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম তো সেই আগের মতোই থাকে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা লাভ তো দূরের কথা, খরচ তুলতেই পারব কি না সন্দেহ আছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি যেন কৃষকদের জন্য সহজে ডিজেলের ব্যবস্থা করা হয় এবং ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা হয়।

ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল এলাকার কৃষক শান্ত জানান, দুনিয়ার সবকিছুর দাম বাড়ে। কৃষকের দাম বাড়ে না। দুদিন যাইয়া ঘুরে আইছি তেল পাইনি। আবার আজকে যাইয়া ২ লিটার তেল পেয়েছি। দুই লিটার তেল দিয়ে কী হয়? আমাদের ৫ লিটার তেল লাগে এক বিঘা জমি চাষ করতেই, এখন আমাদের চরের সব জমি খালিই আছে। আমরা পাট বুনতে পারছি না। 

বর্তমানে প্রতি বিঘা জমিতে ধান আবাদে খরচ হচ্ছে ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা। তবে তেলের দাম, সার বীজ ও কৃষি সরঞ্জামসহ দাম বৃদ্ধির কারণে তা বেড়ে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। যার  ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে লোকসানের মুখে পড়ার শঙ্কা আরও বাড়ছে। তবে অনেক কৃষকের মতে, যদি সহজে ডিজেল পাওয়া যায়, তাহলে বাড়তি দামের চাপ কিছুটা সহনীয় হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জামালপুরে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান এবং প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসল আবাদ হয়েছে। জেলায় ডিজেলচালিত সেচ পাম্প রয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার, আর বিদ্যুৎচালিত পাম্প ১৯ হাজার ৭০০টি। শুধু বোরো চাষে দৈনিক প্রায় ৪২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও সরবরাহ রয়েছে তার অর্ধেকেরও কম। জেলার ১৭টি ফিলিং স্টেশনসহ ২০টি জ্বালানি তেল বিক্রয় কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে মজুত থাকে ১০ থেকে ১৫ হাজার লিটার ডিজেল।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক না ছড়াতে এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে কৃষিপণ্যের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। ডিজেলের দাম বাড়ায় যেন কোনো ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়। আমরা কৃষকদের পাশে আছি। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে যাতে কৃষকরা সহজে তেল পায়, সেই চেষ্টা চলছে। এখন কৃষকদের কিছু খরচ বাড়বে। আমরা কৃষকদের সহযোগিতা করব যাতে তাড়া তাদের ন্যায্য দামটা পাই। প্রয়োজনে আমরা মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কথা বলব কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।