কুমিল্লার নানুয়াদিঘির সেই মণ্ডপে দুর্গাপূজা, কড়া নজরদারি

কুমিল্লা নগরের নানুয়াদিঘির উত্তর পাড়ের আলোচিত সেই মণ্ডপে এবারও শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর পবিত্র কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে এই মণ্ডপে হামলা ও দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। তবে অতীত ভুলে এবারও কঠোর নিরাপত্তা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপনের নানামুখী প্রস্তুতি নিয়েছেন আয়োজকেরা। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বেচ্ছাসেবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, যা আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে।
জানা গেছে, স্থানীয় দর্পণ সংঘের উদ্যোগে নগরের নানুয়াদিঘির উত্তর পাড়ে ঘাটলাসংলগ্ন সড়কের পাশে তৈরি করা হয়েছে পূজামণ্ডপ। এবার আগের বছরের তুলনায় মণ্ডপের আকার কিছুটা ছোট রাখা হয়েছে। মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন, সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ শেষ পর্যায়ে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্নে পূজা উদ্যাপন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন কুমিল্লার নানুয়াদিঘির উত্তর পাড়ের একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই মণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি কুমিল্লার গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। সেই ঘটনার পর থেকে নানুয়াদিঘির এই মণ্ডপের দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এবারও পূজার প্রস্তুতির পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
নানুয়াদিঘির পাড় এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব উদ্যাপন করে আসছেন। এবারও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বজায় রেখে আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে চান তারা। একই সঙ্গে ২০২১ সালের মতো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সেজন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন।
এলাকার এক পুণ্যার্থী বলেন, হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করব। এতে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না বলে আশা করছি। ইতিমধ্যে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।
আলোচিত এই দর্পণ সংঘের সভাপতি এবং বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের কুমিল্লা মহানগর শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শ্রী অচিন্ত দাশ টিটু এশিয়া পোস্টকে বলেন, আশা করছি, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর শারদীয় দুর্গোৎসব আরও জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপিত হবে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে। প্রতিবছরই এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপগুলোতে নানা আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে আগ্রহ দেখা যায়।
তিনি বলেন, উৎসবকে আনন্দমুখর করে তুলতে মণ্ডপে বিভিন্ন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রতিটি পূজামণ্ডপে সতর্ক নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাতে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেছেন তিনি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সচেতনতা তৈরিতে পুলিশের দলগুলো বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, জেলার ১৭টি উপজেলায় প্রায় ৮৬০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে মুরাদনগর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি এবং নাঙ্গলকোট উপজেলায় সবচেয়ে কম পূজামণ্ডপ রয়েছে।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপন নিশ্চিত করতে আনসার ও ভিডিপি সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।