কুমিল্লার বাঁশি বাজে ইউরোপে

‘শ্যামের বাঁশির সুর যেন বাঁশিতে তার বাঁধা, বন্ধু আমার শ্যাম কালিয়া আমি যে তার রাধা’ বেবী নাজনীনের এই গানের কথা–কোনো এক সময়ের গ্রাম বাংলার তরুণ-তরুণীদের আবেগ ঘিরে রচিত। সেই সময় এখন শুধু কল্পনাতেই সম্ভব, বাস্তবে খুব একটা দেখা মেলে না।
তবে এই গ্রাম বাংলার বাঁশি যদি ইউরোপের কোনো দেশে বাজতে শোনা যায়–বাঁশিপ্রেমীদের পুলকিত হওয়ার কথা। সেটাই ঘটাচ্ছেন কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশি তৈরির কারিগররা।
শ্রীমদ্দি ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১৩০টি পরিবার বাঁশি তৈরির সঙ্গে জড়িত। এখানকার তৈরি বাঁশি এখন বিদেশেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার সহায়তায় এখানকার বাঁশি রপ্তানি হচ্ছে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
দেশে পহেলা বৈশাখ কিংবা লোকজ কোনো উৎসব ঘিরে এই কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। চৈত্র মাস থেকে শুরু হয় বাঁশি তৈরির ব্যস্ততা। তাদের তৈরি বাঁশির মধ্যে রয়েছে আড়, মুরালি, খিলা, নাগিন, বেলুনসহ বিভিন্ন নাম ও নকশার বৈচিত্র্য।
কারিগর আবুল কাশেম জানান, একটি বাঁশি তৈরি করতে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রথমে মুলি বাঁশ কেটে রোদে শুকানো হয়। এরপর ছাঁচ ছাড়িয়ে বাঁশ প্রস্তুত করে স্কেলের সাহায্যে নির্দিষ্ট মাপে দাগ কেটে চোখা শিক ও কয়লার মাধ্যমে ছিদ্র করা হয়। বিশেষ করে আড় বাঁশির ক্ষেত্রে কাদামাটি দিয়ে নকশা তৈরি করে আগুনে সেঁক দেওয়া হয়, ফলে বাঁশির গায়ে দৃষ্টিনন্দন নকশা ফুটে ওঠে। পরে শিরিষ কাগজ দিয়ে মসৃণ করে বিভিন্ন রঙে সাজিয়ে বাজারজাত করা হয়।
তবে এই শিল্প বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা। তাদের অভিযোগ, বিদেশে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কুমিল্লার এই ঐতিহ্যবাহী বাঁশিশিল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই সীমিত। যথাযথ সহায়তা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে শ্রীমদ্দির বাঁশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এবং হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য নতুনভাবে পুনর্জীবন পাবে।
কারিগর অনিল বিশ্বাস বলেন, প্লাস্টিকজাত পণ্যের দাপটে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বাঁশির চাহিদা। পাশাপাশি দক্ষ কারিগরের অভাব এবং কয়লার উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহিদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেশীয় ঐতিহ্য রক্ষায় শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশি শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারিভাবে কীভাবে এই শিল্পকে সহায়তা ও স্বীকৃতি দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করা হবে।