logo

ঝিনাইদহ/এক বছর বেতন নেই, তবুও গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন ৫ চালক

এক বছর বেতন নেই, তবুও গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন ৫ চালক
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসের গাড়িচালক আব্দুর রাজ্জাক। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রতিদিন মাঠে ছুটে চলেন তারা। কৃষকের জমি পরিদর্শন, সরকারি প্রণোদনা বিতরণসহ কৃষি বিভাগের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাদের গাড়িই ভরসা। অথচ সেই গাড়িচালকেরাই প্রায় এক বছর ধরে বেতন পাচ্ছেন না। ঝিনাইদহের পাঁচ উপজেলা কৃষি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পাঁচ চালকের এমন পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে গিয়ে তারা পড়েছেন চরম আর্থিক সংকটে।

ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর, শৈলকুপা, কোটচাঁদপুর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়িচালকেরা এই সংকটে রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও মাস শেষে প্রাপ্য পারিশ্রমিক মিলছে না। ফলে কেউ দোকানে বাকি করছেন, কেউ স্বজনের কাছ থেকে ধার করছেন। আবার কেউ পরিবারের খরচ মেটাতে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।

তাদের একজন আব্দুর রাজ্জাক। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কৃষি অফিসের গাড়িচালক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। শুরুতে একটি প্রকল্পের আওতায় বেতন পেতেন। চাকরিজীবনে বিভিন্ন সময়ে বেতন পেতে দেরি হয়েছে, এমনকি বেতন বন্ধও ছিল। তবে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত টানা বেতন বন্ধ রয়েছে।

আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি ইউনিয়নের ধানহাড়িয়া-চুয়াডাঙ্গা গ্রামে। বর্তমানে তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। মেয়েটি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, আর ছেলের বয়স ১৬ মাস। সংসারের আয় বলতে এখন স্ত্রীর দর্জির কাজ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ।

বেতন বন্ধ থাকার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে চাকরি করছি। এত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছি। বেতন দেরি হয়েছে, বেতন বন্ধও ছিল। তারপরও চাকরি ছেড়ে দিইনি। কারণ এই চাকরিটাই আমার পরিবারের ভরসা। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এক টাকাও বেতন পাইনি।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রতিদিন অফিসের গাড়ি নিয়ে বের হই, কর্মকর্তাদের নিয়ে মাঠে যাই, কৃষকের কাছে যাই। অথচ নিজের সন্তানদের জন্য ঠিকমতো খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিতে পারি না।

তিনি বলেন, মেয়ের পড়াশোনার খরচ রয়েছে। ছোট ছেলেরও নানা প্রয়োজন। মেয়ে কিছু চাইলে অনেক সময় তাকে বলতে হয়, এখন না, পরে দেব। কিন্তু সেই পরে আর আসে না। একজন বাবা হিসেবে বিষয়টি তার জন্য খুব কষ্টের।

স্ত্রীর দর্জির কাজের কথা উল্লেখ করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমার স্ত্রী সেলাইয়ের কাজ করে। ওই আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলছে। একদিকে বাজারের খরচ, অন্যদিকে সন্তানদের পড়াশোনা, সব মিলিয়ে খুব কষ্টে আছি। ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। মানুষের কাছে হাত পাততেও লজ্জা লাগে। আমরা তো কাজ করছি, আমাদের বেতনটাই চাইছি; কারও দয়া চাইছি না।

তিনি আরও বলেন, সারাদিন অন্যের সংসারের কাজ সচল রাখতে গাড়ি চালাই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গেলে কৃষকের কাজ হয়, কৃষকের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে। কিন্তু দিন শেষে যখন নিজের ঘরে ফিরি, তখন মনে হয়, আমার সংসারের চাকা কেন চলছে না?

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বেতন পাওয়ার আশায়। এখন তাদের দাবি, দ্রুত বেতন চালু করার পাশাপাশি বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হোক।

শুধু আব্দুর রাজ্জাক নন, জেলার অন্য উপজেলা কৃষি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়িচালকদেরও একই অভিযোগ। তাদের ভাষ্য, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচি, কৃষকের জমি পরিদর্শন, সরকারি প্রণোদনা বিতরণ ও কৃষি কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়মিত গাড়ি চালাতে হয়। সরকারি দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি না থাকলেও বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার গাড়িচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, বেতন না পাওয়ায় দোকানে বাকি করতে হয়েছে, মানুষের কাছ থেকেও ধার করতে হয়েছে। সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে না পারলে একজন বাবার যে কষ্ট হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

শফিকুল ইসলাম বলেন, অফিসের গাড়ি ঠিকমতো চলার জন্য যেমন জ্বালানি লাগে, আমাদের সংসার চালাতেও তো টাকার প্রয়োজন। তাদের কারও কাছে সাহায্য নয়, কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক সময়মতো পাওয়াই প্রত্যাশা বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়িচালকদের বেতন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা খুবই নিম্ন আয়ের মানুষ। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ায় সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মো. কামরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিনই তাদের কষ্ট আমাদের চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে। একজন মানুষ সারাদিন দায়িত্ব পালন করার পরও যদি মাস শেষে তার পারিশ্রমিক না পান, তাহলে তার পরিবারের ওপর কী ধরনের চাপ পড়ে, সেটা সত্যিই বেদনাদায়ক। আমরা বিষয়টি নিয়ে নিজেরাও উদ্বিগ্ন।

তিনি বলেন, দ্রুত তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা হলে এসব মানুষের পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।