logo

চুয়াডাঙ্গায় লোডশেডিং যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

চুয়াডাঙ্গায় লোডশেডিং যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

জ্বালানি সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের ঘাটতি ৩৫ থেকে ৪৬ শতাংশ হওয়ায় প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এতে শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ।

গ্রীষ্মের শুরু থেকেই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তালিকায় প্রায় প্রতিদিনই থাকছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলা। তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিং যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে অনেক সময় এক ঘণ্টার আগে ফিরে আসে না। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন তারা।

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিক্ষা, ব্যবসা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। সামনে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় ব্যাঘাতের শিকার হচ্ছে। রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেকেই বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে মশার উপদ্রব বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে।

এদিকে হঠাৎ করে ঘনঘন লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনার কারণে ব্যবসা আগেই সীমিত হয়ে গেছে। তার ওপর দিনভর বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। এতে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। দর্শনা পৌরসভার রেলবাজার এলাকার টেলিকম ব্যবসায়ী রমজান আলী বলেন, ‘ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যায়। তার ওপর সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখতে হয়। ক্রেতারাও আসছেন না, ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা এসপি লেনের চা দোকানি রফিক জানান, আগে গ্যাস বা মাটির চুলায় চা তৈরি হলেও এখন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায় ধস নেমেছে। চাহিদার সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতা হারাতে হচ্ছে। 

কম্পিউটার ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় কাজের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলে কাজ নেই, আর কাজ এলে বিদ্যুৎ থাকে না এমন—অবস্থায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ গৃহিনী শারমিন বলেন, ‘বিদ্যুতের এতো লোডশেডিং, তার ওপরে তীব্র গরম, বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে থাকা মুশকিল। শুনছি, লোডশেডিং আরও বেশি হবে। আতঙ্কে আছি।’ 

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। কৃষক জামাল হোসেন ও আসান আলী জানান, সেচ পাম্প চালাতে না পারায় বোরো ও আউশ ধানের চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে সেচযন্ত্র নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির মজুতও ফুরিয়ে আসছে। যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) ঝিনাইদহ উপকেন্দ্র থেকে চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর জোনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। চুয়াডাঙ্গা জেলায় বিদ্যুৎ সরবাহ করে দুটি সংস্থা। শহর এলাকায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) আর গ্রাম এলাকায় মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অধীনে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ৫ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৪টি। চুয়াডাঙ্গায় ১৩২/৩৩ কেভির একটি গ্রীড থেকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১২টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে তার গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। 

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানায়, চলতি মাসে তাদের চাহিদা ১৪২ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে যখন যেমন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তেমন পাচ্ছে। গেল দুদিন পরিস্থিতি একটু ভালো ছিল। চলতি সপ্তাহে ১৪২ মেগাওয়াটের মধ্যে ৯২ মেগাওয়াট পাওয়া গেছে।

পিজিসিবি ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার স্বদেশ কুমার ঘোষ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বর্তমানে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে আমাদের কিছুই করার নেই। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ না বাড়লে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

এ বিষয়ে ওজোপাডিকোর চুয়াডাঙ্গার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব এশিয়া পোস্টকে বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং বেড়েছে। এ সংকট সমাধান না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।