ফ্যামিলি কার্ডের জনবল নিয়োগে অনিয়ম, বিএনপির বিক্ষোভ

বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক মেগা প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এই বিতর্কিত নিয়োগ তালিকা অভিলম্বে বাতিলের দাবিতে ফেনীতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের সামনে এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের সংক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিক্ষোভকারী নেতাদের গুরুতর অভিযোগ, ফেনী সদর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির উদ্দেশ্যে মাঠপর্যায়ে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা হয়নি। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অসাধু উপায়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯ জন কর্মীর অধিকাংশই স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। শুধু তা-ই নয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের কয়েকজনের সঙ্গে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং অনেকে অন্যান্য গুপ্ত রাজনৈতিক দলের সাথে গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে জড়িত বলে দাবি করেন বিএনপি নেতারা।
সমাবেশে নেতারা বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্যপীড়িত, দুস্থ ও প্রকৃত সাহায্যপ্রার্থীদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। আর এজন্য স্থানীয়ভাবে সর্বজন গ্রহণযোগ্য, সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তথাকথিত নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মূল্যায়ন পরীক্ষায় স্বজনপ্রীতি ও চরম অনিয়ম পরিচালনা করা হয়েছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে ফেনী সদর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক দিদারুল আলম দিদার বলেন, আমরা মনে করেছিলাম এ দেশ থেকে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেছে, তবে এখন দেখছি তারা প্রশাসনের সব সেক্টরে বহাল তবিয়তে বসে আছে। তারা বর্তমান সরকারকে আন্তর্জাতিক ও সামাজিকভাবে বিতর্কিত করার জন্য নানাভাবে কূটকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প ফ্যামিলি কার্ডের সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে এমন বিতর্কিত লোকজনকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমার নিজ ওয়ার্ডেই একটি চিহ্নিত আওয়ামী পরিবারের দুই বোনের মধ্যে একজনকে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং অপর বোনকে রাখা হয়েছে অপেক্ষমাণ তালিকায়। এটিই প্রমাণ করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা প্রশ্নবিদ্ধ ও স্বৈরাচারী কায়দায় সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসন যদি দ্রুত এই অনিয়মের সুষ্ঠু সমাধান না করে এবং বিতর্কিত নিয়োগ তালিকা বাতিল না করে, তবে ফেনী সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্দোলন আরও তীব্র করে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব কাজী কামরুল আহসান বলেন, আমার ইউনিয়নে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩ জনের মধ্যে তিনজনকে স্থানীয়রা চেনে। বাকিদের অনেকেই গুপ্ত রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ও আওয়ামী লীগের দোসর বলে আমরা সুনির্দিষ্ট খবর পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পে যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন, তাদেরকে যদি এলাকার মানুষই না চেনে, তবে সরকারের এই জনকল্যাণমূলক স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? আমাদের এলাকার পরিচিত অনেক যোগ্য এমবিএ ও বিবিএ পাস করা বেকার তরুণ পরীক্ষা দিয়েছিল, কিন্তু তাদের কোনো মূল্যায়নই করা হয়নি। আমরা মনে করি এতে কর্তৃপক্ষের চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম রয়েছে। তাই অবিলম্বে এই প্রহসনের তালিকা বাতিল করতে হবে।
ধলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন ফোরকান মাস্টার বলেন, আমার ইউনিয়নে ১৯ জনের মধ্যে মাত্র চারজনকে চিনি। বাকিদের অনেকেই গুপ্ত রাজনৈতিক দল ও নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সদস্য। তাদের দিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের মতো সংবেদনশীল প্রকল্প কতটুকু সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব, তা আমাদের বোধগম্য নয়। অনতিবিলম্বে এই বিতর্কিত তালিকা বাতিল করে সব মহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন করে মাঠকর্মীদের তালিকা করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বালিগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আইয়ুব আলী, পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর নবী মেম্বার, লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক রিপন মেম্বার, মোটবী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, ছনুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর আলম এবং ফাজিলপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একরামুল হকসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আল আমিন সরকার বলেন, বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ও অভিযোগের বিষয়ে নিবিড় খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



