
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন। কর্মজীবনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলীর চাকরি। পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ অফিসারের চাকরি ছেড়ে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা। কর্পোরেট সুযোগ সুবিধা ছেড়ে কেন শিক্ষকতা পেশায় বেছে নিয়েছেন তা এখন বড় প্রশ্ন?
বলছিলাম নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নায়লা সারাফের কথা।
নায়লা শারাফের ভাষ্য, আমি একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছি। বেড়ে উঠা ঢাকার মোহাম্মদপুরে। ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বুয়েটে ভর্তি হই। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। চাকরি বা টাকার প্রতি আমার কখনই লোভ ছিল না। আমি একাকিত্ব ও আড়ালে থাকতেই পছন্দ করি। আমার ভাবনা অন্যদের সঙ্গে মিলবে না।
তিনি আরও জানান, পড়ালেখা শেষ করে এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি নিই। পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে সেই চাকরি ছেড়ে দিই। পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ অফিসার পদেও দায়িত্ব পালন করি। এ ছাড়াও বিসিএস পরীক্ষায় রিটেন পাশ করেও ভাইবা দিইনি। দেশের বাইরে থেকেও অনেক চাকরির অফার ছিল। মানুষ চাকরিকে অনেক গুরুত্ব দিলেও আমার কাছে এর কোন গুরুত্ব নেই। আমার জীবনে কোন অভাব নেই। আমি ছোট থেকে যে সুযোগ সুবিধা পেয়েছি তা সবাই পায়না। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি কারণ সেখানে মানসিক শান্তি পাই। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে পেরে আনন্দ খুঁজে পাই। আমি সবসময় সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করি। কর্পোরেট চাকরির যে মন মানসিকতা প্রয়োজন তা আমার নেই। আমি নিরবে সাধারণ জীবনযাপন করতে চাই। আমার ব্যাক্তিগত প্রাইভেসি নষ্ট করতে চাই না। আমার সিদ্ধান্ত কোন অনুকরণীয় নয়।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, নায়লা ম্যাডাম আমাদের খুব আদর করে পড়ায়। পড়া না পারলে কখনো মারপিট করেন না। বরং আরও ভালো করে বুঝিয়ে দেন। ম্যাডাম ক্লাস খুবই ভালো লাগে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিলা রাণী ভৌমিক জানান, নায়লা সারাফ ২০১৭ সালে এই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ান। তবে এখানে যোগদানের পূর্বে বিসিএস উত্তীর্ণ হয়েছেন কি না অথবা তিনি ছেড়েছেন কি না তা আমরা অবগত নই।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইটি) মুনমুন জাহান লিজা বলেছেন, এটা সম্পূর্ণ উনার ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত। সবার ব্যাক্তিগত পছন্দ ও ভালো লাগা থাকতে পারে। উনি যেখানে কম্পোর্ট মনে করেছেন সেখানেই চাকরি করছেন।
সামাজিক পদমর্যাদা বা ক্ষমতার চেয়ে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা মজবুত করা এবং তাদের গড়ে তোলাই তার কাছে আসল আত্মতৃপ্তি। সমাজে যেখানে উচ্চপদস্থ চাকরিকেই সফলতার একমাত্র মাপকাঠি মনে করা হয়, সেখানে নায়লা শারাফের এই সিদ্ধান্ত এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একটি চাকরির অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সেখানে নায়লা সারাফ পদদলিত করেছেন অসংখ্য কর্পোরেট চাকরির সুযোগ।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার এই পদক্ষেপ তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নতুন প্রেরণা।
