রাবার ড্যাম প্রকল্প নিয়ে ‘উন্নয়ন সার্কাস’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম’ প্রকল্পটি এখন উন্নয়নের এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় বন্দি। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে যখন ধুমধাম করে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, তখন লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাড়ে তিন বছরের সেই কাজ এখন ৯ বছরে গিয়ে ঠেকছে এবং প্রকল্পের ব্যয় মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় ১১০ কোটি টাকা বেড়ে ২৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে।
দীর্ঘ এই সময়ে প্রকল্পটির নকশা ও বরাদ্দ সংশোধন করা হয়েছে তিন দফায় এবং কাজের মেয়াদ ১ দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছিল ১৮২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় সংশোধনীতে তা আরও বাড়িয়ে করা হয় ২৪৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। সর্বশেষ গত রোববার একনেক সভায় তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদনের মাধ্যমে প্রকল্পের মোট ব্যয় এখন দাঁড়িয়েছে ২৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অবকাঠামোগত কাজ ৯৯ শতাংশই শেষ। কিন্তু রহস্যজনকভাবে বাকি থাকা মাত্র ১ শতাংশ কাজের জট খুলতে নতুন করে আরও প্রায় ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল দপ্তর থেকে জানানো হচ্ছে, জমি অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধ না করায় স্থানীয় জমির মালিকরা কাজে বাধা দিচ্ছেন। ফলে ১ শতাংশ কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, একটি মেগা প্রকল্পের ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হতে যেখানে ৯ বছর সময় লাগে এবং শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়, সেখানে শুরুতেই কেন ভূমি অধিগ্রহণের মতো মৌলিক বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হলো না। কেনই বা সামান্য ১ শতাংশ কাজের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা প্রয়োজন হচ্ছে তা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন অভিজ্ঞ ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই দীর্ঘসূত্রতা এবং দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি মূলত সুশাসনের অভাব ও ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনারই প্রতিফলন। তার মতে, ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর সামান্য কাজের জন্য ২২ কোটি টাকার সঙ্গে বাড়তি দীর্ঘ সময় চাওয়া প্রকৌশলবিদ্যার যুক্তিতেও বেমানান।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ যত বাড়ে, প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক খরচ তত বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়; যা পরোক্ষভাবে সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ বা গুঞ্জনকে নাকচ করে দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ড্যাম নির্মাণের মূল কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। নতুন করে বরাদ্দ হওয়া এই টাকা ড্যাম নির্মাণের মূল কাজে ব্যয় করা হবে না, বরং এটি জমি অধিগ্রহণের পাওনা পরিশোধে ব্যয় করা হবে।
ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে কেউ নেতিবাচক গুঞ্জন করলে তা অবাস্তব হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এটি দেশের বৃহত্তম রাবার ড্যাম। শুরুতে অনেক কিছু প্রয়োজন হবে না মনে হলেও পরবর্তী সময়ে কাজ করতে গিয়ে নকশা পরিবর্তন এবং নতুন নতুন উপকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। যার ফলেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।