স্বামীকে হারিয়ে শিশুটিকে নিয়ে দিশেহারা কবিতা

স্ত্রী, ১৬ মাস বয়সী কন্যা ও মাকে নিয়ে ছোট্ট একটি সংসার ছিল মাইক্রোবাস চালক মো. নাইম শেখের। কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় সেই সংসারের সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফবাস ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম শেখও।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার আগের দিন বুধবার বাড়ি থেকে গাড়ি চালানোর উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় স্ত্রী ও মেয়েকে বলেছিলেন, ফিরে এসে ঈদের কেনাকাটা করবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর রাখা হয়নি। বাড়িতে ফিরেছেন ঠিকই, তবে জীবিত নয়—লাশ হয়ে।
নিহত নাইম রামপাল উপজেলার জিগিরমোল্লা গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে। ২০১৯ সালে তিনি মোরেলগঞ্জ উপজেলার শনিরজোর গ্রামের কবির হোসেনের মেয়ে কবিতা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন নাইম। কবিতা সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শেষ করেন। পরে স্বামীকে সহযোগিতা করতে মোংলা ইপিজেডের একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন।
পারিবারিক জটিলতার কারণে নিজের পৈতৃক বাড়িতে থাকতে না পেরে মোংলার কুমারখালি গ্রামের শিকারি মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন নাইম। অন্যের মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়েই চলত তাদের সংসার।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাড়া বাড়ির উঠানে বালু নিয়ে খেলছে নাইমের ১৬ মাস বয়সী কন্যা নওশীন নাঈম নুসাইবা। মাঝে-মাঝে মায়ের কোলে উঠে বাবার খোঁজ করছে। কিন্তু সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি—তার বাবা আর কখনও ফিরে আসবেন না। স্বামীকে হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী কবিতা।
নাইমের স্ত্রী কবিতা আক্তার বলেন, আমাদের নিজেদের কোনো জমিজমা নেই। স্বামীই সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। এখন আমার ছোট বাচ্চা আর শাশুড়িকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব বুঝতে পারছি না। সরকার যদি আমাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে অন্তত সন্তানটাকে মানুষ করতে পারতাম।
নাইমের স্বজনরা জানান, পরিবারের আর কেউ উপার্জন করার মতো নেই। নাইমের স্ত্রী শিক্ষিত হওয়ায় সরকার তাকে কাজের ব্যবস্থা করে দিলে পরিবারটি বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে।
নাইমের দাদি জাহানারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে মানুষ হয়েছে আমার নাতি। মা, বউ আর বাচ্চা নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকত। অন্যের গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাত। এখন ওদের কী হবে, কে দেখবে তাদের?
নাইমের ছোট চাচি আজমিরা বেগম বলেন, নাইম ড্রাইভারি করে সংসার চালাত। এখন তার মা, স্ত্রী ও ছোট মেয়েটি খুব অসহায় হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি—নাইমের স্ত্রীকে যেন একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।