logo

শসার জমিতে রঙিন তরমুজ চাষে নীলফামারীর ওমর আলীর চমক

রাশেদ ইসলাম
নীলফামারী
শসার জমিতে রঙিন তরমুজ চাষে নীলফামারীর ওমর আলীর চমক
তরমুজ ক্ষেতে ওমর আলী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময় যে জমিতে চাষ করতেন শসা, সেই জমিতেই এবার মাচাং পদ্ধতিতে ফলিয়েছেন রঙিন তরমুজ। নতুন ফসল, নতুন অভিজ্ঞতা সঙ্গে ছিল লোকসানের ভয় আর মানুষের নানা কথা। তবু দমে যাননি নীলফামারী সদর উপজেলার কৃষক ওমর আলী। পরিচিত এক ব্যবসায়ীর পরামর্শে শুরু করেন রঙিন তরমুজের চাষ। তিন বিঘার বেশি জমিতে এখন তার প্রায় ছয় হাজার গাছ রয়েছে। শুরুতে ব্যয় হয়ছে প্রায় তিন লাখ টাকা। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে এই আবাদ থেকেই সাত থেকে নয় লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

ওমর আলীর জমিতে চাষ হচ্ছে কিং সুগার ও সূর্য ডিম জাতের রঙিন তরমুজ। কৃষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে কিং সুগার জাতের প্রায় চার হাজার এবং সূর্য ডিম জাতের প্রায় দুই হাজার গাছ রয়েছে। ঢাকা থেকে একটি কোম্পানির মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করে জমিতে রোপণ করেন তিনি। চাষের প্রায় ৫০ দিন পার হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৭০ দিনের মধ্যে তরমুজ বিক্রির উপযোগী হবে বলে আশা করছেন এই কৃষক।

জানা যায়, প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে মাচাং পদ্ধতিতে রঙিন তরমুজ চাষ করছেন ওমর আলী। জমিতে মাচা তৈরি করে তার ওপর গাছের বিস্তার ঘটিয়েছেন তিনি। এ পদ্ধতিতে গাছ ও ফলের পরিচর্যা, রোগবালাই পর্যবেক্ষণ এবং ফলের সুরক্ষায় বিশেষ নজর দিতে হচ্ছে তাকে। নতুন ফসলের পাশাপাশি মাচাং পদ্ধতিতে চাষ করায় অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হচ্ছে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রথমবারের এই আবাদ থেকে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন তিনি।

আগে একই জমিতে শসা চাষ করতেন ওমর আলী। উৎপাদিত শসা বিক্রি করতেন এক ব্যবসায়ীর কাছে। সেই ব্যবসায়ীর পরামর্শেই রঙিন তরমুজ চাষের পরিকল্পনা করেন তিনি। তরমুজ বিক্রি না হলেও প্রতি মণ ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে কিনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন ওই ব্যবসায়ী। সেই ভরসা এবং নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই চাষে নামেন ওমর আলী।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

তবে শুরুটা সহজ ছিল না। নতুন ফসল হওয়ায় চাষপদ্ধতি সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। উৎপাদন ব্যর্থ হলে বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কাও ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এলাকার মানুষের নানা মন্তব্য। সব শঙ্কা উপেক্ষা করে নিজের উদ্যোগ ও পরিশ্রমের ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যান তিনি।

রঙিন তরমুজের আবাদে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে রোগবালাই ও পরিচর্যার চ্যালেঞ্জ। পোকামাকড়ের আক্রমণ, ফল পচে যাওয়া কিংবা সেচ ব্যবস্থাপনায় সামান্য ভুলেও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই ফলের সুরক্ষায় জমিতে প্রায় ছয় হাজার নেট ব্যাগ ব্যবহার করেছেন কৃষক। প্রতিটি ব্যাগে রাখা হয়েছে একটি করে তরমুজ।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাষের একপর্যায়ে ওমর আলীর তরমুজগাছ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। পরে কৃষি কর্মকর্তারা তাঁর জমি পরিদর্শন করেন। চাষের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করে তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। প্রথমবারের অভিজ্ঞতায় কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলেও কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সেসব সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করছেন তিনি।

নীলফামারীর ওমর আলীর তরমুজ ক্ষেত। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নীলফামারীর ওমর আলীর তরমুজ ক্ষেত। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ওমর আলীর হিসাব অনুযায়ী, তিন বিঘার বেশি জমিতে রঙিন তরমুজ চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে মোট বিক্রির পরিমাণ সাত থেকে নয় লাখ টাকা হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে এই হিসাব সম্ভাব্য বিক্রির। উৎপাদিত তরমুজের পরিমাণ, ফলের গুণগত মান, রোগবালাইয়ের ক্ষতি, বাজারদর ও অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভর করবে প্রকৃত লাভ। ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তরমুজ কেনার যে আশ্বাস পেয়েছেন, সেটি বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা-ও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমবারের এই চাষে সফল হতে পারলে ভবিষ্যতে আরও পরিকল্পিতভাবে রঙিন তরমুজের আবাদ বাড়াতে চান ওমর আলী। তার আশা, নতুন এই ফসল একদিকে যেমন তার আয়ের সম্ভাবনা বাড়াবে, অন্যদিকে এলাকার কৃষকদেরও বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী করে তুলতে পারে।

ওমর আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার শুরুটা এত সহজ ছিল না। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা বলেছেন। লোকসান হবে, ফল হবে না এমন আরও কত কথা শুনতে হয়েছে। তবে আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটিতে অটল ছিলাম। কারণ, এর আগে যখন শসা চাষ শুরু করি, তখনো মানুষ একই রকম কথা বলেছিলেন। তাই ভয়টা কম ছিল।

তিনি আরও বলেন, বীজ সংগ্রহ করে রোপণের পর যখন ফল আসতে শুরু করে, তখন আবার ওই ব্যক্তিরাই বলেন, তাঁরাও চাষ করবেন। তবে ফসল আসার পর আমার বাগান একটি রোগে আক্রান্ত হয়। তখন কিছুটা হিমশিম খেতে হয়। এরপর তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আশা করছি, ফল বিক্রির পর মোটামুটি একটা লাভের মুখ দেখতে পারব।

প্রথমবারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমবার চাষ করতে গিয়ে অনেক ভুল হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা এসে বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছেন। আগে যেসব বিষয় জানা ছিল না, সেগুলো শিখতে পেরেছি। তারা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। আগামীতে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করতে পারলে আরও বেশি লাভবান হতে পারব বলে আশা করছি।

নীলফামারীতে রঙিন তরমুজ চাষের নতুনত্ব তুলে ধরে ওমর আলী বলেন, নীলফামারীতে এই তরমুজ চাষের উদ্যোগ আমার জানা মতে নতুন। মনের জোরে চাষ শুরু করেছি। আশা করি, এটি লাভজনক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। দিন-রাত জমিতে থাকতে হয়।

নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা তার জমি পরিদর্শন করেছি। তিনি যখন বীজ রোপণ করে চাষাবাদ শুরু করেন, তখন আমাদের অবগত করেননি। আমরা নিজেরাই খোঁজ নিয়ে সেখানে গিয়েছি। তিনি দুই জাতের তরমুজ চাষ করছেন। ফলন ভালো হয়েছে। তবে যতটুকু জেনেছি, একবার তার গাছগুলো বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তিনি আমাদের অবগত করলে আমরা রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দিতে পারতাম।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যেকোনো উদ্যোক্তা এ ধরনের নতুন নতুন ফসল ফলাতে আগ্রহী হলে শুরুতেই নিকটস্থ কৃষি অফিসের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। তাহলে নতুন কোনো রোগ বা সমস্যায় পড়লে আমাদের দপ্তর থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে দ্রুত রোগ নিরাময় করা যেতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা এই উদ্যোক্তার জমি পরিদর্শন করেছি। খুব ভালো ফলন হয়েছে। নীলফামারীতে রঙিন তরমুজ চাষ নতুন উদ্যোগ। তিনি নিজ উদ্যোগে এত বড় উদ্যোগ নিয়েছেন, এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। তার জন্য আমাদের কৃষি অফিস সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে। যেকোনো ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।