চিংড়ির রেণু শিকারে ধ্বংস হচ্ছে শতাধিক প্রজাতির মাছ

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় বলেশ্বর নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে চলছে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু (পোনা) আহরণ। এ রেণু শিকারের ফলে নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে শতাধিক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর পোনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযান চলমান থাকলেও বাস্তবে থামছে না এ পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০০০ সালে সরকার চিংড়ির রেণু আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও উপকূলীয় এ অঞ্চলে তা কার্যত উপেক্ষিত। মৎস্য বিভাগ মাঠপর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা ও অভিযানের কথা বললেও নদী ও খালজুড়ে প্রতিদিনই চলছে রেণু শিকার।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বড়মাছুয়া ইউনিয়নের স্টিমারঘাট, আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের সাংরাইল এবং সাপলেজা ইউনিয়নের খেতাছিড়া এলাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করা হচ্ছে। দিন-রাত পালাক্রমে নারী, পুরুষ এমনকি ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরাও এ কাজে অংশ নিচ্ছে।
পোনা আহরণকারীরা নদী ও খালের মুখে নেট ব্যবহার করে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করেন। পরে এসব রেণু স্থানীয় মহাজন ও আড়তদারদের মাধ্যমে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরে সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করতে গিয়ে গড়ে শতাধিক অন্যান্য মাছ ও জলজ প্রাণীর পোনা মারা যায়। ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। সচেতনতা ও বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে এ ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলেও মনে করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, প্রান্তিক সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে মহাজনরা প্রতি রেণু ১ থেকে ২ টাকা দরে কিনে নেন। পরে এসব রেণু আড়তের মাধ্যমে বিভিন্ন চিংড়ি ঘের মালিকের কাছে ৫ থেকে ৭ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এভাবে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিপুল অর্থের ব্যবসা পরিচালনা করছে।
এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ির পোনা আহরণ করে কিছু দরিদ্র মানুষ সাময়িকভাবে লাভবান হলেও এর ফলে অন্যান্য মাছের পোনা ব্যাপক হারে ধ্বংস হচ্ছে। এটি মৎস্যসম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি। চিংড়ির পোনা আহরণের সময় অন্যান্য মাছের পোনা ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত তদারকিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
মৎস্যজীবী দলের জেলা সভাপতি তরিকুল ইসলাম নজিবুল বলেন, রেণুপোনা নিধন ঠেকাতে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমিও এই কমিটির একজন সদস্য। আমরা সার্বক্ষণিক চেষ্টা করছি অসাধু জেলেরা যেন রেণুপোনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু নিধন না করতে পারে এবং এ বিষয়ে প্রশাসনকে সার্বিক সহযোগিতা করি।
তিনি বলেন, আমরা জানতে পেরেছি— রেণুপোনা প্রতিটি ১ থেকে ২ টাকায় কিনে সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এই পোনাগুলো ৫ থেকে ৭ টাকায় বিক্রি হয়। এই অনিয়মের সঙ্গে যেসব জেলে জড়িত রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া মঠবাড়িয়া উপজেলাসহ প্রতিটি উপজেলায় আমাদের নজরদারি রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, আমরা ঈদের আগে রেণুপোনাসহ কিছু অসাধু জেলেকে ধরেছিলাম, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং অন্যদের জরিমানা করা হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। নদীতে নামলে অবৈধ জাল ও রেণুপোনাসহ সব বিষয়ে নজর রাখি। কোনো অসাধু জেলে এমন কর্মকাণ্ড করলে আমরা অভিযান চালিয়ে আইনের আওতায় আনব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বলেশ্বর নদী ও উপকূলীয় জলাশয়ে অবৈধ রেণু আহরণ বন্ধে নিয়মিত অভিযান, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের মৎস্যসম্পদ মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে।

