logo
Advertisement
বিশ্ব পরিবেশ দিবস

ছাদ হারাচ্ছে চা বাগান, বিষ ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে

এশিয়া পোস্ট নিউজ,মৌলভীবাজার
ছাদ হারাচ্ছে চা বাগান, বিষ ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে
চা বাগানে ছায়াবৃক্ষ বা সেড ট্রি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দূর থেকে কিংবা ছবিতে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মাইলের পর মাইলজুড়ে সবুজ পাহাড়ের ঢালু বুক, যেন এক মায়াবী ক্যানভাস। মৌলভীবাজার জেলাকে দেশের চায়ের রাজ্যে বলা হলেও এই চিরসবুজ সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ক্ষত। জেলার ৯২টি চা বাগানের ভেতরের যে বিপন্ন চিত্র উঠে এসেছে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা।

Advertisement

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা বাগানগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাহির থেকে যে সবুজ দৃশ্য সকলের চোখ জুড়ায় ভেতরে তা বিষাক্ত রাসায়নিকের থাবায় এবং মানুষের লোভে নীরবে ধ্বংস হচ্ছে। রোদের আগুনে পুড়ছে সবুজ চা গাছ। চা বাগানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নির্দিষ্ট অনুপাতে ছায়াবৃক্ষ বা সেড ট্রি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মৌলভীবাজারের বাগানগুলোতে এখন চলছে উল্টো উৎসব। কাঠ চোরাকারবারি চক্র এবং কিছু ক্ষেত্রে বাগান কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় দেদারসে কাটা পড়ছে শতবর্ষী কড়ই, রেইনট্রি, আকাশমনি, চাম্বল ও গর্জন প্রকৃতির গাছ। ছাদ চলে যাওয়ায় সরাসরি সূর্যের তাপে পুড়ছে চা পাতা। বাগানের ভেতরের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা চা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলছে।

এদিকে ​চা পাতা দ্রুত বড় করার অন্ধ প্রতিযোগিতা এবং পোকামাকড় দমনের নামে বাগানগুলোতে চলছে রাসায়নিক সার ও তীব্র কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এই বিষাক্ত রাসায়নিক ধোঁয়া পানি নেমে আসছে স্থানীয় পাহাড়ি ছড়ায়। ফলে পানির অম্লতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। ব্যাঙ, ফড়িং থেকে শুরু করে চিল শকুনও হারিয়ে যাচ্ছে এই খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত হওয়ার কারণে।

শুধু তাই নয় ​চা বাগানের বুক চিরে বয়ে যাওয়া রুপালি সুতোর মতো প্রাকৃতিক ছড়াগুলো এখন বালু খেকোদের দখলে। এক শ্রেণির প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে ছড়াগুলো থেকে দিনরাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।

মৌলভীবাজারের পরিবেশকর্মী নুরুল মোহাইমিন মিল্টন এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাসায়নিক সার, কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার এবং ছায়াবৃক্ষ উজাড় প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। চা বাগানকে শুধু টাকা বানানোর কল বা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। অবিলম্বে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে যদি জৈব কৃষির দিকে নজর দেওয়া না হয় তবে আগামী কয়েক দশকে এই অঞ্চলের মাটির উর্বরতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। মৌলভীবাজারের গৌরব এই চা বাগানগুলো পরিণত হবে এক একটি ধূসর ও প্রাণহীন মরুভূমিতে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, চা বাগানের পরিবেশ এখন আর আগের মতো নেই। তীব্র রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োগ ও প্রতিনিয়ত ছায়াবৃক্ষ সাবাড়ের ফলে চা বাগানের পরিবেশ এখন হুমকির মুখে।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় চা বাগানগুলোতে জৈব কৃষির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আর কার্যকর হয়নি। চা বাগানের রাসায়নিক ব্যবহার শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, চা শ্রমিক ও বাগানের বাসিন্দাদেরও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সরকার ও চা বাগান মালিকদের দ্রুত এসব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।