চাহিদার অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহ

ঝালকাঠিতে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জেলার চার উপজেলা—ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়াজুড়ে দুর্বিষহ অবস্থা দেখা দিয়েছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক চতুর্থ বর্ষের পরিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ভোগ বেড়েছ ব্যবসায়ীদের।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিনে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর তা বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছে। তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম সরবরাহ পাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বরিশালের দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের একাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব এলাকায় মোট চাহিদা প্রায় ২৮০ মেগাওয়াট হলেও বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া ফিডারে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রিড থেকে এবং নলছিটি ও ঝালকাঠি ফিডারে বরিশাল গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে (ঢাকা থেকে) লাইন বন্ধ করে দিলে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে লোডশেডিং তৈরি হয়।
জেলার রাজাপুর উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এতে এলাকার একটি বড় অংশে লোডশেডিং করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে লো ফ্রিকোয়েন্সি দেখা দেওয়ায় ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) স্ক্যাডা অপারেশনের মাধ্যমে ৩৩ কেভি ফিডার বন্ধ রেখে লোড ম্যানেজমেন্ট করছে। ফলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরিক্ষার্থীরা। ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন এসএসসি পরীক্ষার্থী জানান, সন্ধ্যার সময় সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়। এ সময় পড়ার চাপ বেশি থাকে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটছে।
রাজাপুর পাইলট উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. মিয়াদ বলেন, শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে গরম বাড়ে। আমাদের ২১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষা শুরু হবে। এত পরিমাণে লোডশেডিং হয়, যে কারণে রাতে তো পড়তে পারি না, দিনের বেলাও গরমের কারণে পড়তে পারি না। এতে আমাদের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পড়তে না পারলে লিখব কেমনে?
আনোয়ারা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমাদের সামনে এসএসসি পরীক্ষা। এটা আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনা, মনোযোগ এবং সময় ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গ্রামে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়ে আমাদের সেই ধারাবাহিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। রাতে পড়তে বসলে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে যায়। পড়ার আগ্রহ কমে যায়। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ঠিকমতো শেষ করা যায় না।
রাজাপুরের বাসিন্দারা জানান, গত কিছু দিন ধরে দেখা যাচ্ছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে প্রতিদিনই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি করছে।
ব্যবসায়ীরাদেরও দুর্ভোগে বেড়েছ। ঝালকাঠি শহরের ব্যবসায়ী বারেক মল্লিক বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে ক্রেতা কমে যায়, আবার সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হয়—সব মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছি।
ঝালকাঠি শহরের ইজিবাইক চালক মোসলেম বেপারী বলেন, তেলের সংকটে মোটরযানে চাপ কম থাকায় যাত্রীরা এখন বেশি ইজিবাইকে চলাচল করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে পারি না। ফলে ঠিকভাবে ট্রিপ (ভাড়ায় যাত্রা) মারতে পারছি না। তীব্র গরমে পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হচ্ছে।
এ বিষয়ে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপসহকারী প্রকৌশলী জাকিরুল ইসলাম বলেন, গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার ভিত্তিতেই রোটেশন করে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ফিডারে ১০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলে আমরা ৬ থেকে ৮ মেগাওয়াট পাচ্ছি। ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং কিছুটা বেশি হচ্ছে।
ঝালকাঠির সামাজিক সংগঠন ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটির (ইয়াস) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন রানা বলেন, ঘনঘন লোডশেডিং এখন জনজীবনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি ও আমদানি নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারি দপ্তরসহ নগর এলাকার ভবনগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার প্যানেল ও হাইব্রিড প্রযুক্তি স্থাপন করতে হবে। দেশীয় উৎপাদন ও সহজ আমদানির মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করা উচিত।