
সিরাজগঞ্জের চলন বিলজুড়ে দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির জন্য তৈরি করা হয়েছে একের পর এক মৃত্যুফাঁদ। ধানক্ষেত, বিল ও জলাশয়ের আশপাশে লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ পেতে এবং বাঁধা পাখিকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে অবাধে শিকার করা হচ্ছে পাখি। শুধু শিকারই নয়, ধরা পড়া এসব পাখি প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন প্রকাশ্যেই এ তৎপরতা চললেও প্রশাসনিক নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের অভাবে তা থামানো যাচ্ছে না। ফলে চলনবিলের পাখির নিরাপদ বিচরণ এবং সার্বিক জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়ি পাড়া মৌজার ধানক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, লতাপাতা দিয়ে ঝোপের মতো কাঠামো তৈরি করে তার ওপর জালের ফাঁদ বসিয়েছেন শিকারিরা। ফাঁদের কাছে একটি পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। চোট পাওয়া বা বাঁধা পাখিটি ডানা ঝাপটে ডাকাডাকি শুরু করলে আশপাশের অন্য পাখিরা সেখানে এসে বসার চেষ্টা করে এবং মুহূর্তেই জালে আটকে পড়ে।
শিকারি মোতালেব সেখও একই পদ্ধতিতে পাখি ধরার কথা জানান। তার ভাষ্য, শখের বসে গত তিন-চার বছর ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে পাখি শিকার করছেন। এসময় তাকে কেউ বাধা দেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিকারি জানান, এভাবে পাখি শিকার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বিষয়টি তিনি জানতেন না।
স্থানীয়রা জানান, অনেক সময় শিকার বাড়াতে টোপ বানানো পাখির চোখ অন্ধ করে দেওয়ার মতো নির্মমতার অভিযোগও রয়েছে। শিকার শেষে পাখিগুলো কলাপাতা বা তারের তৈরি খাঁচায় রেখে স্থানীয় বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয়। প্রতিটি পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করে শিকারিরা দৈনিক দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে ক্রেতাদের অনুরোধে পাখি জবাই ও চামড়া ছাড়িয়ে ব্যাগে তুলে দেওয়া হয়।
শীতে চলনবিলে বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে, যা প্রকৃতির ভারসাম্য ও ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত জরুরি। সমাজকর্মী ও ‘দি বার্ডস সেফটি হাউজ’ এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে জানান, চলনবিলে স্বেচ্ছাসেবীরা পাখি রক্ষায় কাজ করছেন। শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হলেও তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে স্থায়ীভাবে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তার মতে, শুধু পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিকারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্য পরিযায়ী ও দেশীয় পাখি চলনবিলে আসে। এসব পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশকে রক্ষা করে। পাখি নিধন দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই পাখি শিকার বন্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়া উচিত।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পরিযায়ী বা যে কোনো পাখি হত্যা ও বেচাকেনা দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট তথ্য পেলেই মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নিয়ামুর রহমান এশিয়া পোস্টকে জানান, এভাবে ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করা অন্যায়। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে পাখি শিকারিদের জরিমানাসহ দণ্ডের বিধান রয়েছে।
তিনি জানান, পাখি শিকার বন্ধে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অসাধু পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
