বরাদ্দ ছাড়াই গণপূর্তের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে ১২ পরিবারের বসবাস

কুষ্টিয়ায় গণপূর্ত বিভাগের পরিত্যক্ত বি-টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১২টি ইউনিটে বসবাস করছেন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা। তাদের কেউ এক বছর, কেউ দুই বছর, আবার কেউ সাত থেকে আট বছর ধরে পরিবার নিয়ে সেখানে থাকছেন। অথচ গণপূর্ত বিভাগ বলছে, এসব ইউনিট কারও নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এমনকি সেখানে কারা বসবাস করছেন, সে বিষয়েও দপ্তরটির কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্ত বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব কোয়ার্টারে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনও পাওয়া যায়নি। পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও সরকারি ভবনগুলোতে বছরের পর বছর ধরে বসবাস চললেও বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে ভবনটিতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলেও জানা গেছে।
কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়া এলাকায় কলকাকলি স্কুলের পাশে অবস্থিত এসব কোয়ার্টারে বসবাসকারীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ ছাড়া স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরাও সেখানে থাকছেন।
১২টি ইউনিটেই পরিবারের বসবাস
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির সামনের অংশ বেশ গোছানো। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা ও বসার জায়গা। তবে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই বারান্দায় শুকাতে দেওয়া ভেজা কাপড়সহ নিয়মিত বসবাসের নানা চিত্র চোখে পড়ে। ১২টি ইউনিটের প্রতিটিতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন কেউ না কেউ।
কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা দরজা বন্ধ করে দেন। আবার কেউ কেউ জানান, তাদের পরিবারের কর্তা সরকারি চাকরি করেন। তবে কোয়ার্টারটি তাদের নামে বরাদ্দ রয়েছে কি না, তা তারা জানেন না।
বসবাসকারী কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান। কেউ গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন, আবার কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। পরিত্যক্ত ভবনে বসবাসের ঝুঁকি এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার কে নেবে, জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘আমাদের জীবনের দায়ভার আমাদের।’
‘এটা তো পরিত্যক্ত ভবন, ভাড়া কেন লাগবে’
স্থানীয় সরকার শাখায় কর্মরত শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি, সরকারি কোয়ার্টারে রয়েছি।’ তবে গণপূর্তের কোয়ার্টারে কীভাবে থাকছেন এবং বরাদ্দ নিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।
দীর্ঘ আট বছর ধরে ওই কোয়ার্টারে বসবাস করছেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মুন্সিখানায় কর্মরত দুয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি। বরাদ্দের আবেদন বহু আগে করেছিলাম।’ তবে পরিত্যক্ত ভবনে কেন বসবাস করছেন, জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে ফোনে কথা বলতে চাই না। আপনি অফিসে আসবেন, সরাসরি কথা বলব। আপনি নিজেও জানেন কীভাবে রয়েছি।’
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নেজারত শাখার সহকারী নাজির সাজিদুল ইসলাম বলেন, ‘হ্যাঁ, ওখানে শুধু আমি নই, আরও অনেকে বসবাস করেন।’ তার নামে কোয়ার্টার বরাদ্দ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো পরিত্যক্ত ভবন, এখানে ভাড়া কেন লাগবে।’ এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
সনো হাসপাতালের কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাবা ম্যাটসের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করেন। এ কারণে আমরা এই কোয়ার্টারে থাকি। কোয়ার্টারটি তার নামে বরাদ্দ কি না, তা আমার জানা নেই। আমরা দেড় বছর ধরে বসবাস করছি।’
পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও বসবাস
জানা গেছে, গণপূর্ত বিভাগের ওই ভবনগুলো কয়েক বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সেখানে বি-টাইপ ও ডি-টাইপের কোয়ার্টার রয়েছে। এর মধ্যে বি-টাইপের কোয়ার্টারগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও এখনও সেখানে একাধিক পরিবার বসবাস করছে। পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও কীভাবে এসব ইউনিটে বছরের পর বছর বসবাস চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিত্যক্ত সরকারি কোয়ার্টারের ১২টি ইউনিটে কারা, কীভাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে বসবাস করছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গণপূর্ত বিভাগ বরাদ্দের তথ্য না জানলেও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস চলছে। তদন্তের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা বেরিয়ে আসতে পারে।
তদন্তের আশ্বাস গণপূর্তের
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মহসীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এখানে কারও নামে কোনো বরাদ্দ নেই। কেউ বসবাস করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার এখনো তেমন কিছু জানা নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখব। কারও যোগসাজশ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, কোয়ার্টারটি বি-টাইপের এবং কয়েক বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে তিনি জানেন।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেই সেখানে থাকা যাবে না, বিষয়টি এমন নয়। ভবনটি বসবাসের কিছুটা উপযোগী হলে সরকারকে রাজস্ব দিয়ে সেখানে বসবাস করতে হবে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


