বুড়িরবাঁধে মাছ ধরার ধুম, বড় মাছের দেখা নেই

মাছ ধরতে প্রতিবছর ঠাকুরগাঁওয়ের বুড়িরবাঁধে আসেন রাণীশংকৈল উপজেলার জেলে বাবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে মাছ কম। তবে এবার মাছ নেই বললেই চলে। গতকাল রাত থেকে জাল ফেলছি। অল্প কিছু ছোট মাছ ছাড়া বড় কোনো মাছ জালে ওঠেনি। সব জায়গা বাঁশ দিয়ে দখল করে রেখেছেন স্থানীয় লোকজন। আর রিং জালের কারণে জালে মাছ উঠছে না। তাই মাছ না নিয়েই বাড়ি চলে যাচ্ছি।’
শুধু বাবুল হোসেন নন, এবার বেশির ভাগ জেলেই বুড়িরবাঁধে মাছ পাননি। মাছ কম পাওয়ার কারণ হিসেবে রিং জালের ব্যবহার এবং বাঁশঝাড় দিয়ে খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে রাখার কথা জানিয়েছেন তারা।
১৯৮০ সালে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের সুবিধার জন্য ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের মাঝামাঝি একটি জলকপাট নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেই জলকপাটে আটকে থাকা পানিতে প্রতিবছর মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা ছাড়া হয়। আর এসব পোনার দেখভাল করেন আকচা ও চিলারং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা।
শুক্রবার রাতে বুড়িরবাঁধে জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর শনিবার সকাল থেকে শুরু হয় মাছ ধরার মহোৎসব। এতে জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ ছাড়াও আশপাশের জেলার লোকজন অংশ নেন। পলো, ঠেলা, বাদাই, খেয়া, টানা, ফিকা ও কারেন্ট জালসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে মাছ শিকারে নামেন তারা। অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই শৌখিন মাছ শিকারি।
পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে মাছ শিকার করতে আসা বিশু পাল বলেন, প্রতিবছর এই সময় বুড়িরবাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা সবাই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠি। তবে এবার তেমন মাছ পাইনি। অল্প কিছু দেশি মাছ ধরেছি। এগুলো নিয়েই বাড়ি ফিরব।

মাছ শিকারি আরিফ বলেন, গতকাল রাত থেকে কলাগাছের ভেলায় করে মাছ ধরছি। যা মাছ পেয়েছি, তাতে সারা রাতের কষ্ট বৃথা। বড় মাছ পেয়েছি তিনটি, যার ওজন হবে দুই কেজি। আর ছোট মাছ পেয়েছি প্রায় চার কেজি। আমরা মোট তিনজন পঞ্চগড় থেকে এসেছি। এতে আমাদের পোষাবে না।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা থেকে বুড়িরবাঁধে মাছ ধরতে আসা মাহাবুব হোসেন বলেন, রাতে মাছ ধরতে এসেছি। পানি বেশি থাকায় বাঁধে নামিনি। সকাল ৬টায় নেমেছি। এখন পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে তিন থেকে চার কেজির মতো মাছ পেয়েছি। শুধু আমি নই, আমার এলাকার আরও বেশ কয়েকজন এসেছেন। আমরা মূলত শখের কারণে আসি। আর কিছুক্ষণ থাকব। যা পেয়েছি, তাতেই খুশি।
শহরের রোড এলাকা থেকে আসা আব্দুর রহমান বলেন, শহরের কয়েকজন বন্ধু মিলে জাল কিনে মাছ ধরতে এসেছি। তবে বড় মাছ না পেলেও ছোট মাছ ধরেছি তিন কেজি। মূলত শখের বশেই আসা। তবে মাছ ধরার আনন্দ অনেক। এখানে হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরছেন।
পঞ্চগড়ের বোদা থেকে মাছ শিকার করতে আসেন ইমু। তিনি বলেন, বুড়িরবাঁধে মাছ ধরার কথা অনেক শুনেছি। তাই দুই ভাই শখ করে মাছ ধরতে এসেছি। এখন পর্যন্ত দুই কেজির মতো মাছ ধরেছি। বড় কোনো মাছ এখনো ধরতে পারিনি।
সদরের নারগুন ইউনিয়নের বসির আহম্মেদ বলেন, আগের মতো বাঁধে আর মাছ নেই। বাঁধের পানি ছাড়ার আগে আশপাশের লোকজন ছিপ দিয়ে বড় সব মাছ তুলে ফেলেন। স্থানীয় কিছু লোক বাঁশঝাড় দিয়ে সব জায়গা দখল করে রেখেছেন। তারপরও বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার মানুষ প্রতিবছর এখানে মাছ ধরতে আসেন। কেউ বেশি পান, কেউ কম। এখন বুড়িরবাঁধ মাছ ধরার উৎসবে পরিণত হয়েছে।
আকচা ইউনিয়নের নওশাদ বলেন, প্রতিবছরই এই মাছ ধরার উৎসব চলে। মাছ ধরতে জাল, খইয়া জাল, পলো ও মাছ রাখার খালুই নিয়ে গ্রাম ও শহরসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ আসেন। যাদের মাছ ধরার সরঞ্জাম নেই, তারা হাত দিয়ে মাছ ধরেন। এক কথায়, বুড়িরবাঁধ এলাকা মিলনমেলায় পরিণত হয়।
বুড়িরবাঁধে মাছ কিনতে আসা আইনুল হক বলেন, প্রতিবছর এই বাঁধ থেকে দেশি মাছ কিনে নিয়ে যাই। সকাল ৮টার দিকে এখানে দেশি মাছ কিনতে এসেছি। এখন প্রায় ১২টা বাজে। মাছ তেমন চোখে পড়েনি। অল্প কিছু মাছ উঠেছে, যার দাম দ্বিগুণ। তবে এবার মাছ না কিনেই ফিরতে হবে।
আরেক মাছ ক্রেতা বলেন, এবার মাছের দাম অনেক বেশি। তবে কিছু পাইকার অন্য জায়গার মাছ এখানকার মাছ বলে বিক্রি করছেন। দাম অনেক, এবার আর তেমন মাছ নেই বললেই চলে। দুই কেজি রুই মাছ কিনেছি ৮০০ টাকায়।
কালিবাড়ি বাজার থেকে মাছ কিনতে আসা প্রবীর রায় বলেন, আমি মাছের ব্যবসা করি। কালিবাড়ি বাজারে আমার মাছের দোকান আছে। যারা নিয়মিত মাছ ধরেন, তাদের কাছ থেকে মাছ কিনে নিয়ে বিক্রি করি। যারা মাছ পান না, তারা আমাদের কাছ থেকে মাছ কিনে বাড়ি নিয়ে যান। তবে আগের তুলনায় এবার মাছ অনেক কম। এ কারণে মাছের দামও একটু বেশি।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শিমলা রাণী রায় বলেন, প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহে বুড়িরবাঁধের জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয় এবং মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আমাদের ইউপি সদস্যরা বুড়িরবাঁধ এলাকা দেখাশোনা করেন। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে এখানে মাছ ধরেন। এখানে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এটি উৎসবে পরিণত হয়। তবে এবার মাছ কম। এবার মানুষের সংখ্যাও অনেক কম।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরাফাত উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ৫০ একর এলাকাজুড়ে সুক নদীর ওপর নির্মিত বুড়িরবাঁধ একটি মৎস্য অভয়াশ্রম। সারা বছর কাউকে এখানে মাছ ধরতে দেওয়া হয় না। আমাদের কর্মকর্তারা সব সময় এটি তদারকি করেন। শুধু জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়ার পর এ সময়ই মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়। এ বছর এখানে বিভিন্ন জাতের ২৫ কেজি মাছের রেণু ছাড়া হয়েছিল।
