logo
পুলিশের অভিযান ঘিরে উত্তেজনা

চট্টগ্রামে মেয়র-পুলিশ টানাপোড়েনের নেপথ্যে কী

• তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারে চসিকে অভিযান

• মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগর ভবন ঘিরে ফেলে পুলিশ

• পরে বগাকে গ্রেপ্তার না করেই নগর ভবন এলাকা ছাড়ে পুলিশ

• পুরো ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত’ বলছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন

চট্টগ্রামে মেয়র-পুলিশ টানাপোড়েনের নেপথ্যে কী
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ভবনের সামনে পুলিশের অভিযানের সময় উৎসুক জনতার ভিড়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কার্যালয় থেকে তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে ‘তোপের মুখে’ খালি হাতে ফিরেছে পুলিশ। নিরাপত্তা বাহিনী বলছে, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে সেখানে যায় তারা। পরে এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে পিছু হটে। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে পুলিশের টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে আসে। এই টানাপোড়েনের ঘটনায় সামনে আসছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারে রাতে চসিক ভবন ঘিরে ফেলে খুলশী থানা পুলিশ। রাত সাড়ে ৯টার দিকে এই অভিযান চালানো হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন কর্মকর্তা ভবনে প্রবেশ করেন। এ সময় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তাদের অবিলম্বে ভবন ত্যাগের নির্দেশ দেন। বাধার মুখে বগাকে গ্রেপ্তার না করেই নগর ভবন এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয় পুলিশ।

মেয়র শাহাদাত হোসেন অবশ্য পুলিশকে বাধা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, পুরো ঘটনা ছিল ‘পরিকল্পিত’। খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিম ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগসাজশে এ কাজ করেছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগর ভবনে বগার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপরই চসিক কার্যালয়ের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের তালিকাভুক্ত এক আসামি সেখানে অবস্থান করছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থান নেয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি।’

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওয়াকিল হোসেন বগা সেখানে ছিলেন না। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এবং বর্তমানে খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগ জানাতে বগার দুই ভাই এসেছিলেন। মেয়র হিসেবে আমি কেবল তাদের অভিযোগ শুনেছি। এর বাইরে অন্য কিছু ঘটেনি।’

তিনি বলেন, ‘এই পুরো বিষয়টা পরিকল্পিত। সামনে চসিক নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ওসি আব্দুর রহিম এই কাজ করেছে। সে ফ্যাসিবাদের সময়ে বাকলিয়া থানার ওসি ছিল। সে সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি মেজবান আয়োজন করেছিলাম। সে মেজবানের খাবারও এই ওসি নিয়ে গেছে। এখনও সে এসব করছে।’ কারা ষড়যন্ত্র করছে? এই প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, ‘সেটা যেখানে জানানো প্রয়োজন সেখানেই জানাব।’

এদিকে মেয়রের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুর রহিম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলব না। আমাদের ডিসি (উপপুলিশ কমিশনার) স্যার কথা বলবেন।’ পরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের ডিসি মো. হাসান মোস্তফা স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এ প্রতিবেদক। কয়েক দফা ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালে তিনি সিন করেও কোনো উত্তর দেননি।

এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় পুলিশ। সে সময় পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সেই সুযোগে বগা একটি বসতঘরের গোপন পথ দিয়ে পালিয়ে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চসিকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘মেয়র মহোদয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে নিষেধ করেছেন। তবে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। উদ্দেশ্য যদি সত্যিই বগাকে গ্রেপ্তার করা হতো, তবে পুরো ভবন ঘেরাওয়ের প্রয়োজন ছিল না। নগর ভবন থেকে বের হওয়ার যে দুটি পথ রয়েছে, সেখানে অবস্থান নিলেই তাকে গ্রেপ্তার করা যেত। মনে হচ্ছে, কোনো একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল।’

প্রায় একই ধরনের মতপ্রকাশ করেছেন নগর বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ঘটনার নেপথ্যে দুটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। ঘটনার দিন দুপুরে সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের বিষয়ে মেয়র এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে তিরস্কার করেছিলেন। এর জের ধরে পুলিশের পক্ষ থেকে একধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে দলের ভেতরের রাজনীতি। দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও প্রশাসনের মাধ্যমে এই ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়ে থাকতে পারে।’

এই নেতা বলেন, ‘সামনে চসিক নির্বাচন। গুঞ্জন রয়েছে, সরকারের প্রভাবশালী কোনো প্রতিনিধি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ ও জনপ্রিয় নেতাদের কোণঠাসা করতে একটি বিশেষ বলয় সক্রিয় রয়েছে। দলীয় আধিপত্য বিস্তারে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের একধরনের চর্চা লক্ষ করা যাচ্ছে।’

মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ‘যে কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের তৎপরতাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। সিটি করপোরেশন সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে কে গেল না গেল তা সব সময়ই মেয়র জানবেন; এটাও ঠিক না। এই ঘটনায় মেয়রকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কেন কী ঘটেছে এই বিষয়ে পুলিশের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।’