logo

মুখ চেনার উপায় নেই, অলংকার দেখে প্রিয়জন খুঁজছেন স্বজনেরা

মুখ চেনার উপায় নেই, অলংকার দেখে প্রিয়জন খুঁজছেন স্বজনেরা
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের দৃশ্য মোবাইল হাতে স্বজনদের দেখাচ্ছেন ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা রিয়াজ মাহমুদ রিপন। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা রিয়াজ মাহমুদ রিপনের মোবাইল ফোনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের দৃশ্য। ওপাশে থাকা স্বজনেরা দেখতে চাইছেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া প্রিয়জনদের মরদেহ। মোবাইল হাতে নিয়ে তাদের সেই দৃশ্য দেখাচ্ছেন রিপন। ওপাশে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের চোখেও গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। কথা বলতে গিয়ে বারবার ভারী হয়ে আসছিল রিপনের কণ্ঠ। একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে ১০টি মরদেহ। বাইরে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন স্বজন। কেউ ফটকের কাছে গিয়ে উঁকি দিচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোনে খবর নিচ্ছেন। সবার অপেক্ষা একটাই—প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করে শেষবারের মতো দেখা, তারপর বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে এমন দৃশ্য দেখা যায়। মর্গের বাইরে একটি গাছের নিচে অপেক্ষা করছিলেন ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা রিয়াজ মাহমুদ রিপন। সঙ্গে ছিলেন তার ভাই আমিনুল ইসলাম। দীর্ঘ অপেক্ষায় দুজনই ক্লান্ত। কিন্তু সেখান থেকে সরে যাওয়ার উপায় নেই।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের বাইরে অপেক্ষায় কয়েকজন স্বজন। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের বাইরে অপেক্ষায় কয়েকজন স্বজন। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিপন বলেন, ‘আমার ভাইজি মিলিতা মেহজাবিন, ভাগনে নাফিস তেহামী জেরিফ, ভাগনি ফারিহা কবির সাবরিন এবং নাতি ফাইজান নুর—কেউ বেঁচে নেই। তারা কোনো দিন কক্সবাজারে আসেনি। পূজার ছুটিতে এসেছিল।’

রিপন থাকেন ঢাকার উত্তরায়। তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। শনিবার সকালে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। সকাল ৮টার দিকে ভাইয়ের ফোনে দুর্ঘটনার খবর পান। খবর শোনার পর আর দেরি করেননি। বিমানে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দুপুর ১২টার দিকে পৌঁছান সেখানে। রিপন বলেন, ‘আমাদের পরিবারের নয়জন ছিল। ছয়জন মারা গেছেন। তিনজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তারা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’

শনিবারের পুরোটা সময় হাসপাতালেই কাটে তার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স মর্গে পৌঁছায়। কিন্তু মরদেহগুলোর অবস্থা এমন ছিল যে দেখে কাউকে চেনার উপায় ছিল না। তবু প্রিয়জনদের শনাক্ত করার চেষ্টা থামাননি রিপন। পরিচিত মুখ দেখা না গেলেও মনে পড়ছিল তাদের পরনের পোশাক, হাতের অলংকার কিংবা শরীরের বিশেষ কোনো চিহ্নের কথা।

রিপন বলেন, ‘আমার ভাগনের হাতে সোনালি রঙের একটি ব্রেসলেট ছিল। সেটি দেখে একটি মরদেহকে ভাগনের বলে মনে হয়। ভাইজির বাঁ পায়ে নূপুর ছিল। ভিডিওতে নূপুরটি দেখে ভাতিজিকেও শনাক্ত করেছি।’

তবে অলংকার বা শারীরিক কোনো চিহ্ন দেখে ধারণা করা আর আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। মর্গে থাকা কয়েকটি মরদেহের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হয়নি। তাই পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে স্বজনদের।

রিয়াজ মাহমুদ রিপন বলেন, ‘রোববার বেলা ১১টার মধ্যে ঢাকার মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে আমার বড় ভাই, বোনজামাইসহ নিহত স্বজনদের আত্মীয়েরা রক্তের নমুনা দিয়েছেন। এখন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর অপেক্ষায় আছি।’

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, মরদেহগুলোর অবস্থা সরেজমিনে পরীক্ষা না করে কত শতাংশ পুড়ে গেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। সিআইডির দল নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাবে। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

কক্সবাজার অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে সেখানেই ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

এর আগে, শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল আটটার দিকে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত রিসোর্টটি থেকে একে একে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আহত হয়ে ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।