
একসময় যশোর শহর ও আশপাশের এলাকায় পুকুর ছিল মানুষের নিত্যদিনের জীবনের অংশ। পুকুরের পানি ব্যবহার থেকে শুরু করে মাছ চাষ, গরমে স্বস্তি কিংবা আগুন নেভাতে—বিভিন্ন প্রয়োজনে এসব জলাধার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনবসতি বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের চাপে একের পর এক পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে জেলার প্রাকৃতিক জলাধার। গত এক যুগে যশোর জেলায় কমেছে ১৪ হাজার ৮১৩টি পুকুর।
শহরের বহু ঐতিহ্যবাহী পুকুরও এখন নেই। কোথাও গড়ে উঠেছে ভবন, কোথাও বসতবাড়ি কিংবা নতুন প্লট। জলাধার হারানোর এই প্রবণতায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর যেমন পড়ছে বিরূপ প্রভাব, তেমনি অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক সময় জেলায় পুকুর ছিল ৫৩ হাজার ৯৪২টি। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ১২৯টিতে। অর্থাৎ এক যুগের ব্যবধানে জেলার ১৪ হাজার ৮১৩টি পুকুর বিলীন হয়েছে।
পুকুর কমে যাওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র যশোর পৌরসভা এলাকায়। গত এক থেকে দেড় দশকে শহরের প্রধান ডাকঘরের সামনের পুকুর, রেলগেটের চোরমারা দীঘি, নিরালা সিনেমা হলের পাশের পুকুর, বেজপাড়ার শ্রীধর পুকুর, আরবপুরের বড় পুকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সড়কে ইসমাইল ডাক্তারের বাড়ির পেছনের বড় দীঘি, ইসলামিয়া স্কুলের পুকুর, পুরাতন কসবা আবু তালেব সড়কের পুকুর, ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেনের পুকুর, মন্টুদের পুকুর, নিরিবিলি পুকুর, রাজুদের পুকুর, মুন্সীবাড়ি পুকুর, আয়নাল খাঁর পুকুর, জব্বার বিহারীর পুকুর, গোহাটা পুকুর, রাজবাড়ী বিদ্যুৎ অফিসের সামনের পুকুর, ষষ্ঠিতলাপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনের পুকুর, খালধার সড়কের পুকুর, এসপি অফিসের পুকুর ও পুলিশ লাইনের পুকুরসহ বহু জলাধার অস্তিত্ব হারিয়েছে।
শহরের ভেতরে থাকা আরও অনেক পুকুর এখন সমতল ভূমি। কোথাও সেখানে গড়ে উঠেছে স্থাপনা, আবার কোথাও প্লট আকারে বিক্রিও হচ্ছে। সম্প্রতি বারান্দিপাড়া ও চাঁচড়া এলাকার দুটি পুকুরও ভরাট করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। শুধু পুকুর নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ও নিম্নভূমি ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। হরিণার বিলসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি ভরাট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে আবাসন গড়ে উঠলেও কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আন্দোলনের (বাপা) যশোর জেলা সভাপতি আজিজুল হক মনি বলেন, একটি শহরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজায়ন থাকা প্রয়োজন। অথচ যশোরে সবুজায়নের পরিমাণ মাত্র ৭ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রভাবশালী মহল পেশিশক্তি ব্যবহার করে খাল, নালা, পুকুর, জলাশয় ও নিম্নভূমি দখল-ভরাট করছে। এসব জায়গায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। ফলে যশোর ক্রমেই ইট-পাথরের জঞ্জালের শহরে পরিণত হচ্ছে। এখন জরুরি পরিস্থিতি যেমন- কোথাও আগুন লাগলে নেভানোর জন্য পানি পাওয়া যায় না। ফায়ার সার্ভিসও সেবা দিতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।
যশোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, পুকুর, খাল, ডোবা ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির উৎস খুঁজে পেতে ফায়ার সার্ভিসকে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় বেশি লাগে। এতে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, যশোর শহরকে অগ্নিঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে পানির রিজার্ভ ব্যবস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান পুকুরগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যক্তি উদ্যোগেও নতুন জলাধার তৈরি করা দরকার। অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, জলাশয় কমে যাওয়ার কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। আগে যেসব পুকুর, খাল ও জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত, সেগুলোর অনেকটাই এখন বিলীন হয়ে গেছে। জলাশয় রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশীয় মাছ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) বিএম কামাল আহমেদ বলেন, শহরের পুকুর ও জলাশয় রক্ষায় পৌরসভা নিয়মিত নজরদারি করছে। কোথাও পুকুর বা জলাশয় ভরাটের তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জলাধার রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন ও সহযোগী হতে হবে।
যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, পুকুর বা জলাশয় ভরাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জলাশয় ভরাট না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

