হারিয়ে যাচ্ছে ‘কুঁড়েঘরের শিল্পী’ বাবুই পাখি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খাগড়াছড়ি
হারিয়ে যাচ্ছে ‘কুঁড়েঘরের শিল্পী’ বাবুই পাখি
ছবি: সংগৃহীত

ভোরের আলো ফোটার আগেই তালগাছের ডালে ডালে বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে একসময় মুখরিত থাকত পাহাড়ি জনপদ। খড়, ধানের পাতা, খেজুরের আঁশ আর কাশবনের লতা দিয়ে নিপুণ কারিগরিতে তৈরি তাদের ঝুলন্ত কুঁড়েঘরগুলো প্রাকৃতির এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং মানবসৃষ্ট নানা প্রতিকূলতায় খাগড়াছড়ির পাহাড় থেকে প্রকৃতির এই শিল্পী পাখি আজ দ্রুত হারিয়ে যেতে বসেছে।

Advertisement

দুই বছর আগেও খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ির মারমাপাড়া, স্বনির্ভর এলাকার খবং পুড়িয়া, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ও গুগড়াছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বাবুই পাখি ও তাদের দৃষ্টিনন্দন বাসা চোখে পড়ত। অথচ বর্তমানে সদর উপজেলার দক্ষিণ গোলাবাড়ির একটি তালগাছে ঝুলে থাকা মাত্র কয়েকটি বাসা যেন অতীতের সেই সোনালি স্মৃতির সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। একসময় যে গাছগুলো বাবুইয়ের কলতানে মুখর থাকত, সেগুলো আজ একদম নীরব। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাখিপ্রেমীরা এখন হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

দক্ষিণ গোলাবাড়ির বাসিন্দা শুভ দে বলেন, দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের উঠানের তাল ও নারকেল গাছে বাবুই বাসা বুনছে। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর পাখির সংখ্যা অনেক কম। আগে আশপাশের খেজুর গাছে শত শত বাসা দেখা যেত, এখন পাখিগুলো আর আসে না।

একই আক্ষেপ প্রকাশ করে লাব্রেচাই মারমা বলেন, আগে সকালে বাবুইয়ের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙত, যা এখন আর তেমন শোনা যায় না।

স্থানীয় বাসিন্দা রুমেল মারমা ও প্রীতি ত্রিপুরা জানান, প্রতি বছর জুন মাসে গ্রামের গাছগুলোতে বাবুই পাখিরা শৈল্পিক বাসা তৈরি করত, কিন্তু এবার সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। প্রকৃতির এই বিস্ময় নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর চোখে দেখার সুযোগ পাচ্ছে না।

পরিবেশপ্রেমী সাথোয়াই মারমা বলেন, পাহাড়ে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের অপব্যবহার, শিকারিদের দৌরাত্ম্য, অপরিকল্পিত বসতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বর্তমানে বাবুই পাখি বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ কর্মী মাহফুজ রাসেল বলেন, একসময় খাগড়াছড়িতে প্রচুর বাবুই দেখা যেত। তাল, সুপারি ও নারকেল গাছে তারা বাসা বানাত। কিন্তু মানুষের বসতি বাড়ছে, গাছ কমছে, ধানক্ষেত হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাবুইয়ের খাবার ও নিরাপদ আবাসও কমে গেছে। এখনকার অনেক শিশুই বাবুই পাখিকে শুধু বইয়ের পাতায় চেনে।

তিনি আরও বলেন, পাখিদের পছন্দের গাছ না থাকায় এখন বাধ্য হয়ে তারা আম বা বটগাছেও বাসা বানানোর চেষ্টা করছে, যা উদ্বেগজনক। তাল, খেজুর, সুপারি ও নারকেল গাছ সংরক্ষণ এবং নতুন করে রোপণের মাধ্যমে বাবুইয়ের জন্য নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে হবে।

বিষয় :খাগড়াছড়ি