অন্ধকারে ৫৫ কোটি টাকার বালিরটেক সেতু, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

মানিকগঞ্জের কালিগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ৫৫ কোটি টাকার বালিরটেক সেতু এখন অন্ধকারে ডুবে থাকা এক ঝুঁকিপূর্ণ পথে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বছর আগে চালু হওয়া এই সেতুতে দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রিটলাইট অচল ও রেলিংয়ের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকা ঢেকে যায় ঘোর অন্ধকারে। এতে প্রতিদিন বাড়ছে ছিনতাই, মাদকসেবন ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা—আর ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে যানবাহন চালকরা।
জেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালিগঙ্গা নদীর ওপর প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৪৫৬ মিটার দীর্ঘ বালিরটেক সেতুটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে বাস্তবায়িত হয়। ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর কাজ শুরু হয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সেতুটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এই সেতু চালুর ফলে মানিকগঞ্জ সদর, সিংগাইর ও হরিরামপুর উপজেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। দূরত্ব কমেছে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং যাতায়াত সময়ও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এই সেতু।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে নির্মিত এই সেতুটি দিনভর স্বাভাবিক থাকলেও রাত নামলেই সেটি পরিণত হয় ঝুঁকিপূর্ণ এক অন্ধকার পথে। দ্রুত স্ট্রিটলাইট সচল এবং বাকি কাজ সম্পন্ন না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বালিরটেক বাজারসংলগ্ন সেতুটিতে দিনের বেলায় যানবাহন ও মানুষের চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়। সেতুর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত কোথাও কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। সেতুর মাঝামাঝি অংশে দাঁড়ালে চারপাশে শুধু অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। এতে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও ছোট যানবাহন চালকদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে হেডলাইটের ওপর নির্ভর করেই চলাচল করতে হচ্ছে। এ ছাড়া সেতুর দুপাশে রেলিংয়ের কাজ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।
স্থানীয়রা জানান, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে প্রায়ই সেতুর আশপাশে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়। মাঝে মাঝে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সেতু দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী সিএনজি অটোরিকশা চালক আক্তার হোসেন বলেন, ‘আমাদের গভীর রাতেও এই ব্রিজ দিয়ে যেতে হয়। লাইট না থাকায় সামনে কী আছে বোঝা যায় না। কখন যে দুর্ঘটনা হবে বা ছিনতাইকারীর মুখোমুখি হব, সেই ভয় সবসময় কাজ করে।’
মোটরসাইকেল চালক সায়েম মিয়া বলেন, ‘দিনের বেলায় এই সড়কে কোনো সমস্যা নেই। তবে সেতুর দুই পাশের রেলিংয়ের কাজ শেষ হয়নি। এলাকায় ছোট ছোট সেতুতেও রেলিং থাকে। শুধু আমাদের এই সেতুতে নেই। আর রাতে বিড়ম্বনার কথা বলে শেষ করা যাবে না। অন্ধকারের কারণে হঠাৎ করে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখা যায় না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রুমানা রহমান বলেন, ‘আলো না থাকায় আমরা সন্ধ্যার পর এই সেতু দিয়ে চলতে ভয় পাই। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য খুবই অনিরাপদ হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজন না হলে আমরা আর এই পথে যাই না। তবে নিরাপত্তার জন্য এই সেতুর লাইটগুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন।’
বালিরটেক বাজারের এক ব্যবসায়ী আরমান বলেন, ‘আগে যেখানে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকত, এখন সন্ধ্যার পরই বন্ধ করে দিতে হয়। অন্ধকারের কারণে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেছে। চুরি-ছিনতাইয়ের ভয় থাকে সব সময়।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সেতুটি চালুর পর এই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লেও বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সেই গতি কমে যাচ্ছে। স্থানীয়দের শঙ্কা, দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে স্ট্রিটলাইট চালুর পাশাপাশি সেতুর বাকি অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হবে। তা না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অপরাধের ঘটনা ঘটতে পারে।
ভাড়ারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সেতুটি আমার ওয়ার্ডে পড়েছে। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। এতে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে। তাছাড়া মাদকসেবীদের আনাগোনা ভালো পরিমানে বেড়েছে। দ্রুত স্ট্রিটলাইট চালু করা খুবই জরুরি।’
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুতে আলো না থাকা অবশ্যই উদ্বেগজনক। বিষয়টি এলজিইডির সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’