logo
Advertisement

জয়পুরহাট/কানাইপুকুরে গাছগুলো যেন পাখিদের বহুতল বাড়ি

এশিয়া পোস্ট নিউজ,জয়পুরহাট
কানাইপুকুরে গাছগুলো যেন পাখিদের বহুতল বাড়ি
কানাইপুকুরে সবুজ গাছের পাতা ঢেকে গেছে পাখির মেলায়; সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করছে শত শত পাখি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ গাছগুলোতে কোনো পাতা নেই—চারপাশে যেন ফুটে আছে অসংখ্য পাখি। কোনো ডালে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও দল বেঁধে বসে আছে বাসার ওপর। কেউ ডানা মেলছে, কেউ খাবার নিয়ে ফিরছে নীড়ে, আবার কেউবা নির্বিকার দাঁড়িয়ে দেখছে চারপাশ। পাখিদের অবিরাম কূজনে বাতাসে তৈরি হচ্ছে এক অপার্থিব আবহ। প্রকৃতি যেন এখানে নিজের হাতে সাজিয়েছে পাখিদের জন্য এক বিশাল সংসার।

Advertisement

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কানাইপুকুর পাখি কলোনিতে এখন এমনই দৃশ্য। গাছের শাখা-প্রশাখা, কাণ্ড ও পাতার ফাঁকে ফাঁকে হাজারো পাখির বসতি। একেকটি গাছ যেন একেকটি বহুতল নীড়—উপর থেকে নিচ পর্যন্ত শুধু পাখি আর পাখি। তাদের আনাগোনা, ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটানোর শব্দে নিস্তব্ধ প্রকৃতিও পেয়েছে প্রাণের স্পন্দন।

কলোনির গাছগুলোর দিকে তাকালে চোখে পড়ে পাখিদের ব্যস্ত সংসার। কোথাও পাশাপাশি বসে থাকা কয়েকটি পাখি, কোথাও বাসার ভেতর ছানাদের ঘিরে অভিভাবকের ব্যস্ততা। আবার কোনো কোনো পাখি গাছের উঁচু ডালে উঠে মেলে ধরছে বিশাল ডানা। সব মিলিয়ে কানাইপুকুর যেন কৃত্রিম কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয়, বরং পাখিদের নিজেদের হাতে গড়ে তোলা এক জীবন্ত নগরী।

এই দৃশ্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করছেন পাখিদের বিচিত্র মুহূর্ত। তবে ছবি তোলার চেয়েও বড় হয়ে উঠছে প্রকৃতির এই আয়োজনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা।

দর্শনার্থী ইমামা নুর বলেন, এখানে ঢোকার পর মনে হয় পরিচিত কোনো জগতের বাইরে চলে এসেছি। চারপাশের সবুজের মধ্যে এত পাখির একসঙ্গে বসবাস সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। পাখিদের ডাক শুনলেই মন শান্ত হয়ে যায়।

দর্শনার্থী ফাহমিদা রোশনি বলেন, গাছের প্রতিটি ডালে যেন আলাদা গল্প। কোথাও পাখির সংসার, কোথাও তাদের বিশ্রাম, আবার কোথাও উড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। এমন দৃশ্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করার বিষয়। জায়গাটি সংরক্ষণ করা গেলে এটি আরও পরিচিতি পাবে।

আরেক দর্শনার্থী রওশনআরা রিফাহ বলেন, ছবিতে অনেক পাখি দেখা যায়, কিন্তু একসঙ্গে এত পাখিকে নিজেদের মতো করে থাকতে দেখার অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনে হয় প্রকৃতি এখানে মানুষের জন্য নয়, পাখিদের জন্যই একটি নিরাপদ ঠিকানা তৈরি করেছে।

পরিবেশকর্মী শাহজাহান আলী বলেন, পাখিরা শুধু এলাকার সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কানাইপুকুরে পাখিদের এমন বড় আবাসস্থল তৈরি হওয়া আমাদের জন্য প্রকৃতির এক মূল্যবান উপহার। এই আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে গাছপালা রক্ষা, পাখি শিকার বন্ধ এবং তাদের নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কানাইপুকুর পাখি কলোনির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাখিরা বছরের পর বছর ধরে এখানে এসে নীড় তৈরি করছে। এখন এই জায়গাটি তাদের একটি নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই, মানুষের অসচেতনতার কারণে যেন পাখিদের এই আশ্রয় নষ্ট না হয়। সবাই সহযোগিতা করলে কানাইপুকুরের এই পাখি কলোনি আরও সমৃদ্ধ হবে।

প্রকৃতির এই নীরব আয়োজনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এখানে পাখিদের জন্য কোনো খাঁচা নেই, নেই কৃত্রিম সাজসজ্জা। আকাশ তাদের ছাদ, গাছ তাদের ঘর আর প্রকৃতিই তাদের অভিভাবক। তাই কানাইপুকুরের গাছগুলোতে পাখির এই অবাধ বসতি শুধু দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যই নয়, বরং মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পাখিদের আবাসস্থল সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। তাহলে কানাইপুকুর কেবল পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা হিসেবেই নয়, জয়পুরহাটের প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে আরও পরিচিতি লাভ করবে।