সমঝোতার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শান্তিপূর্ণ কনসার্ট

কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের আপত্তি ও নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে অনুষ্ঠিত হলো নবীনবরণ, বৃক্ষরোপণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাসে আয়োজিত কনসার্টটি কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়। এতে কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেও একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কলেজের মূল ক্যাম্পাস সংলগ্ন নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে নবীনবরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।
এ সময় জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জহিরুল হক খোকন, সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম ও মমিনুল হক মমিন, সদস্য হাফিজুর রহমান মোল্লা কচিসহ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম উবায়দুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা কোনোভাবেই নিজেদের দুর্বল বা কম মেধাবী মনে করবে না। কারণ তোমরা সরকারি কলেজে পড়ছ। শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে তোমাদের আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শিক্ষা দিয়েছে—কথা বলার রাজনীতি, স্লোগানের রাজনীতি কিংবা হুমকি-ধমকির রাজনীতি আর এই বাংলায় চলবে না। শুধু জাতীয় রাজনীতিই নয়, ছাত্ররাজনীতি করতে গেলেও সহনশীল হতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের পালস, তাদের আচার-আচরণ ও চাহিদা বুঝতে হবে। সেই অনুযায়ী আমাদের কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি পরিচালনা করতে হবে।
নবীনবরণের দ্বিতীয় পর্বে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর আগে দুপুর থেকেই দক্ষিণ ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শিক্ষার্থীরাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে জেলার স্থানীয় শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। পরে ঢাকা থেকে আসা জনপ্রিয় ব্যান্ডদল ‘হাইওয়ে’র হাসান ইথার ও তার দলের সদস্যরা মঞ্চে ওঠেন। গানে গানে তাঁরা শিক্ষার্থীদের মাতিয়ে রাখেন। একপর্যায়ে পুরো ক্যাম্পাস উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তিনটি গান পরিবেশনের পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আসরের নামাজের জন্য বিরতি দেওয়া হয়।
জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের আপত্তির মুখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। মূল ক্যাম্পাস সংলগ্ন মাঠের পরিবর্তে কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক ও জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব সমীর চক্রবর্তী বলেন, হাজারো শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে আবারও প্রমাণ হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংস্কৃতির রাজধানী। হাজার হাজার শিক্ষার্থী কনসার্ট উপভোগ করেছে। কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আমরা অনুষ্ঠানটি সফলভাবে শেষ করতে পেরেছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণির ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ উপলক্ষে এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে নবীনবরণে কনসার্ট আয়োজনের প্রতিবাদ জানিয়ে তা স্থগিতের দাবি তুলেছিল জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
আপত্তির পরও অনুষ্ঠান আয়োজন প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনটির এক নেতা বলেন, কনসার্ট আয়োজন করা হবে না বলে স্থানীয় প্রশাসক ও সংসদ সদস্য আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। এ বিষয়ে আমাদের আর বলার কিছু নেই। বিষয়টি নিশ্চয়ই আমাদের মুরুব্বিরা দেখবেন।
এর আগে সরকারি কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে কনসার্ট আয়োজনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ সদর আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলামের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দেয়। পরদিন বিষয়টি নিয়ে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন সংসদ সদস্য। আলোচনায় কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরের অংশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।


