logo
Advertisement

মায়ের টাকা তুলতে ঘুষ, সেই ক্ষোভে ১৭ বছরের শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’

এশিয়া পোস্ট নিউজ,ময়মনসিংহ
মায়ের টাকা তুলতে ঘুষ, সেই ক্ষোভে ১৭ বছরের শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’
বাঁয়ে ঘুষ.সাইটের লোগো ও আলোচনায় আসা শাহেদ শরীফ আহমেদ। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

মৃত মায়ের সরকারি পাওনা টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয়েছিল—বাবার এমন অভিজ্ঞতা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিল ১৭ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদ। নিজের পাসপোর্ট করাতেও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয় তার। সরকারি সেবা পেতে ঘুষ কেন দিতে হবে—এই প্রশ্ন থেকেই অনলাইনে ঘুষের অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) তৈরি করেছে ময়মনসিংহের এই কিশোর।

Advertisement

গত ২১ আগস্ট সাইটটি চালুর পর উদ্যোক্তাদের দাবি, নয় দিনে সেখানে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের মোট পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা বলে সাইটটির হিসাবে দেখানো হচ্ছে। তবে সাইটে জমা পড়া প্রতিটি অভিযোগ সত্য—এমন দাবি করছে না উদ্যোক্তারা।

শাহেদের মা আমিনা খাতুন ছিলেন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তার চাকরির মেয়াদ ছিল ১৩ বছর।

৭ লাখ টাকা তুলতে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ

পরিবারের ভাষ্য, আমিনা খাতুনের প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা ছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা। সেই টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পরিবারের হিসাবে, সাত লাখ টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা তুলতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। তার ভাষ্য, একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয়েছে। তবে বাকি টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে এবার তিনি আর ঘুষ দিতে রাজি নন।

বাকি ১০ লাখ পেতে আবার ঘুষ দাবি

পরিবারের দাবি, আমিনা খাতুনের কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়ার কথা আরও ৮ লাখ টাকা। মোট ১০ লাখ টাকা পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা আবার ১ লাখ টাকা দাবি করছেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।

কাগজপত্র হাতে শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কাগজপত্র হাতে শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবুর রহমান বলেন, কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলে তিনি সহযোগিতা করেন এবং দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দেন।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন জানান, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ তাকে কিছু জানাননি। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মৃত শিক্ষকের বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।

২ ঘণ্টায় তৈরি ‘ঘুষ.সাইট’

শাহেদের নিজেরও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা রয়েছে। ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ করে সে। তার দাবি, এক হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যেই পাসপোর্টের কাজ এগিয়ে যায়। এরপর একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে ঘুষের অভিযোগ জানানোর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণা পায় শাহেদ। নিজের কোডিং দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মাত্র দুই ঘণ্টায় সাইটটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে সে। পরে বন্ধু সাইফ কবিরের সহায়তায় ডোমেইন কেনা হয়। দুজন মিলে উদ্যোগটির কাজ এগিয়ে নেন।

ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে শাহেদ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়ছে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট তৈরির কাজ শিখেছে। সেই দক্ষতাই কাজে লাগিয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরিতে।

অভিযোগ যাচাইয়ে মডারেশন দল

উদ্যোক্তারা জানান, শাহেদ সাইটটির কারিগরি দিক সামলাচ্ছে, আর সাইফ দেখছে প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়গুলো। অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য চার সদস্যের একটি মডারেশন দলও রয়েছে। সাইটে জমা পড়া অভিযোগগুলো পর্যালোচনা ও স্ক্রিনিংয়ের পর ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে আইনি ঝুঁকি কমাতে অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।

শাহেদ বলেন, ভবিষ্যতে একটি আইনজীবী দল গঠন করা গেলে এবং সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে তথ্য যাচাই ও প্রকাশের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

তার ভাষ্য, তাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানানো নয়; বরং কোথায় কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা। তার ধারণা, কোন দপ্তরে বেশি অভিযোগ, কোন ধরনের সেবায় বেশি ঘুষের দাবি এবং কী পরিমাণ অর্থ চাওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো শনাক্ত করা সম্ভব।

শাহেদের প্রত্যাশা, একদিন এমন সময় আসবে, যখন সরকারি কোনো সেবা পেতে কাউকে আলাদা করে টাকা দিতে হবে না। তার তৈরি ওয়েবসাইটে তখন হাজারো অভিযোগের তালিকা থাকবে না; বরং অভিযোগের সংখ্যা শূন্যের দিকে নামবে। তার চোখে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।

সুশীল সমাজ ও প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি

নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ১৭ বছর বয়সেই শাহেদ নিজের জীবনের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতাকে জনমুখী প্রযুক্তি উদ্যোগে পরিণত করেছে। তবে ‘ঘুষ.সাইট’-এর সাফল্য শুধু কত হাজার অভিযোগ জমা পড়ল বা কত কোটি টাকার ঘুষের দাবি উঠল—তা দিয়ে মাপা যাবে না। অভিযোগগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য, সেগুলোর ভিত্তিতে কোনো দপ্তর বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত হয় কি না এবং নীতিনির্ধারকেরা এসব তথ্য ব্যবহার করেন কি না—সেটিই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘুষ শুধু একজন নাগরিকের আর্থিক ক্ষতি করে না, এটি সরকারি সেবার স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত করে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘুষের অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সরকার চাইলে এ ধরনের তথ্য কাজে লাগিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আশঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে ভুক্তভোগী দুদকে অভিযোগ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হবে। এ ছাড়া আকস্মিক অভিযানও হতে পারে।

বিষয় :