Advertisement

এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদন/বিতর্কিত সেই দরপত্র বাতিল করল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চট্টগ্রাম
বিতর্কিত সেই দরপত্র বাতিল করল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কনটেইনার স্থানান্তরের কাজে দুই বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া বিতর্কিত দরপত্রটি বাতিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।

Advertisement

রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) দপ্তর থেকে জারি করা এক চিঠিতে দরপত্র বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

চবক সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম এশিয়া পোস্টকে দরপত্র বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চবক পরিচালক (ট্রাফিক) স্বাক্ষরিত নোটিশে জানানো হয়, ‘আহ্বানকৃত দরপত্র অনিবার্য কারণবশত যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে বাতিল করা হলো।’

এর আগে, গত ২৪ জুন ‘চট্টগ্রাম বন্দরে দুই প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে দরপত্রে নজিরবিহীন শর্ত’ শিরোনামে এশিয়া পোস্টে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে—জিসিবি এলাকায় খালি কনটেইনার স্থানান্তরের জন্য গত ১৪ জুন আহ্বান করা পাঁচ বছর মেয়াদি দরপত্রে এমন কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা কেবল কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় যুক্ত সাইফ পাওয়ারটেক এবং বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’—এই দুটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব ছিল।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রি-বিড (দরপত্র-পূর্ব) সভায় কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হলেও মূল ‘বিতর্কিত শর্ত’ বহাল রাখা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। অবশেষে খাতসংশ্লিষ্টদের প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর দরপত্রটি পুরোপুরি বাতিল করল বন্দর কর্তৃপক্ষ।

দরপত্র প্রকাশের পর সাধারণ অপারেটরদের আপত্তির মুখে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে সদস্য (অর্থ)-এর সভাপতিত্বে একটি প্রি-বিড সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ দরপত্রের কয়েকটি শর্তে কিছু সংশোধন আনে। ১০ বছরের মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত কমিয়ে বিগত ২৫ বছরের মধ্যে যে কোনো পাঁচ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়। সরঞ্জামের ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা হয়। জামানত এক কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়।

বহাল ছিল ‘স্বার্থরক্ষাকারী’ মূল শর্ত

তবে প্রি-বিড সভায় অন্যান্য শর্তে ছাড় দেওয়া হলেও ঠিকাদারের নিজস্ব ইমপটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাসংক্রান্ত মূল শর্তটি সংশোধন করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ। সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়া এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের প্রতিনিধি নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহারের বিধান বহাল রাখার জোর দাবি জানান এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনার দোহাই দেন।

অন্যান্য অপারেটররা জানান, প্রি-বিড সভায় আর্থিক জামানত বা অভিজ্ঞতার মেয়াদে কিছুটা ছাড় দেওয়া হলেও নিজস্ব সরঞ্জামের মাধ্যমে কাজের যে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে, সেই শর্ত বহাল রেখে প্রকৃতপক্ষে সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসকেই একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কারণ, বিগত ১৭ বছর ধরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বন্দর এলাকায় নিজস্ব ইমপটি হ্যান্ডলার দিয়ে কাজ করার সুযোগই ছিল না। ফলে এই শর্ত বহাল থাকার অর্থ দাঁড়ায়, বাকি অপারেটরদের বাদ দিয়ে পুনরায় ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া।

প্রি-বিড সভার পর দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ১০ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বিতর্ক ও আপত্তি থামেনি। শেষ পর্যন্ত অনিবার্য কারণ দেখিয়ে আহ্বান করা পুরো দরপত্রটিই বাতিল ঘোষণা করল বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রেরিত চিঠির অনুলিপি পাওয়া ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচিত দুই প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ছাড়াও রয়েছে—এম এইচ চৌধুরী লিমিটেড, ফজলীসন্স লিমিটেড, বশির আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, এফ কিউ খান অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড, কিউসি শিপিং লিমিটেড, ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস লিমিটেড, পোর্টলিংক লজিস্টিকস সেন্টার লিমিটেড, এ অ্যান্ড জে ট্রেডার্স এবং এ আর রায়হান টার্মিনাল অপারেটর।

এ বিষয়ে বন্দর পরিচালনাকারী অপারেটরদের শীর্ষ সংগঠন ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, সব ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে স্বচ্ছ, সহজ ও উন্মুক্ত শর্তে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা উচিত। তা না হলে আগের মতোই মামলা বা ডিপিএম (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) প্রক্রিয়ার ফাঁদে ফেলে বছরের পর বছর বন্দরের অর্থ লুটপাটের সুযোগ থেকে যাবে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।