চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম গবেষণার চার দশক: নতুন জাত, নতুন আশা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে আমের ঐতিহ্য—ফজলি, ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, আশ্বিনা। স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত, ‘এ মাটিতে মধু আছে।’ উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ জেলায় জন্মেছে দুই শতাধিক জাতের আম। অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখন পরিচিত ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে।
এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র, যা স্থানীয়ভাবে ‘আম গবেষণাকেন্দ্র’ নামে পরিচিত। জনবলসংকট থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রটি নতুন জাত উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, এখানে রয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি, জেনেটিক রিসোর্স ব্যাংক, নার্সারি, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং প্রায় ৫০ একর গবেষণাক্ষেত্র। দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১৮টি আমের জাত অবমুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি উদ্ভাবিত হয়েছে এই কেন্দ্রেই। সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত চারটি নতুন জাতও এসেছে এখান থেকে।
জনবলসংকটের মধ্যেও সাফল্য
কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জনবলসংকট থাকলেও নতুন জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে সাফল্য উল্লেখযোগ্য। নির্বাচন ও প্রবর্তন পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত জাতগুলো ইতমধ্যে আমপ্রেমীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আম্রপালি ও গৌড়মতি জাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং আম অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।
সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত বারি-৪ ও বারি-১৩ জাত ইতিমধ্যে চাষিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বারি-১৩ একটি রঙিন নাবি জাত, যা মৌসুমের শেষ দিকে পাওয়া যায় এবং রপ্তানিযোগ্য বলে বিবেচিত। এসব জাত উচ্চ ফলনশীল, রোগপ্রতিরোধী এবং তুলনামূলক দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য। গড় জাতের তুলনায় এদের ফলন ২৫–৩০ শতাংশ বেশি।
মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ
গবেষণাকেন্দ্রটি শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। গাছের ছাঁটাই, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং ফল সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ বিষয়ে চাষিরা এখান থেকে পরামর্শ পান।
স্থানীয় আমচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে বছরে একবার ফলন হতো, এখন সঠিক পরিচর্যার ফলে ফলন দেড় গুণ বেড়েছে এবং রোগও কমেছে।
রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ
কেন্দ্রটি জিএপি (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস) অনুসারে চাষাবাদে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য আমের গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ এবং কীটনাশকমুক্ত উৎপাদন নিয়েও গবেষণা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলাই এর লক্ষ্য।
জৈব সার, পানিসাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, ফেরোমন ফাঁদ ও বায়োপেস্টিসাইড ব্যবহারের মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারেও কাজ করছে কেন্দ্রটি। এতে উৎপাদন খরচ কমছে, মাটির উর্বরতা বাড়ছে এবং আমের গুণগত মান উন্নত হচ্ছে।
গবেষকেরা জানান, ভবিষ্যতে জেনেটিক রিসোর্স ব্যাংক শক্তিশালীকরণ, ডিজিটাল ডেটাবেজ এবং ড্রোনভিত্তিক বাগান পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ইনস্টিটিউটের দাবি
স্থানীয়দের মতে, কেন্দ্রটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এটিকে পূর্ণাঙ্গ ‘আম গবেষণা ইনস্টিটিউট’-এ রূপান্তর করা জরুরি। পর্যাপ্ত গবেষক, আধুনিক ল্যাব সুবিধা ও উন্নত অবকাঠামো থাকলে দেশের আমশিল্প আরও এগিয়ে যাবে।
কৃষি উদ্যোক্তা মুনজের আলম বলেন, দেশে অন্যান্য ফসলের জন্য পৃথক গবেষণা ইনস্টিটিউট থাকলেও আমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলের জন্য এখনও পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশ এবং এর এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিষ কুমার রায় বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের আমের সূতিকাগার। এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলে আন্তর্জাতিক মানে গবেষণা জোরদার হবে, নিরাপদ ও মানসম্মত আমের উৎপাদন বাড়বে এবং রপ্তানি সম্ভাবনাও সম্প্রসারিত হবে।