নড়িয়ায় প্রবাসী আয়ে বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি, বাড়ছে সামাজিক সংকট

ইতালি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে বদলে যাচ্ছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতি। একের পর এক তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার দৃষ্টিনন্দন বাড়ি, বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সচ্ছলতা ফিরেছে বহু পরিবারে। তবে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আড়ালে তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক বাস্তবতা—শূন্য বাড়ি, প্রবীণদের একাকিত্ব, স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও তরুণদের শিক্ষাবিমুখতা।
একসময় নদীভাঙন ও দারিদ্র্যে জর্জরিত নড়িয়ার অনেক গ্রামের চিত্র এখন পাল্টে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় প্রতিটি পরিবারের সঙ্গেই প্রবাস জীবনের সম্পর্ক রয়েছে। ইতালিপ্রবাসীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কোনো কোনো এলাকা স্থানীয়ভাবে ‘ইতালিপাড়া’ নামেও পরিচিত।
নলতা গ্রামের আলী আক্কাস সরদারের গল্প এই পরিবর্তনের পাশাপাশি একাকিত্বেরও প্রতিচ্ছবি। পরিবারের চার ভাই-ই প্রবাসে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে ফিরে মায়ের জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেন বিলাসবহুল বাড়ি। কিন্তু বাড়িতে ওঠার কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যান তার মা। বর্তমানে বিশাল ওই বাড়িতে একজন কেয়ারটেকারকে নিয়ে একাই থাকেন তিনি।
নড়িয়ার অনেক পরিবারেই এমন চিত্র দেখা যায়। কোটি টাকা ব্যয়ে ঘর তোলা হলেও সেখানে থাকার মতো মানুষ নেই। সন্তানরা থাকেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, ভিডিও কলে সন্তানদের মুখ দেখেই সান্ত্বনা খোঁজেন বৃদ্ধ বাবা-মা।
প্রবাসী আলী আক্কাস সরদার বলেন, চার ভাই মিলে মায়ের জন্য এই বাড়িটি বানিয়েছিলাম। কিন্তু বাড়িতে ওঠার কয়েকদিন পরেই মা মারা যান। এখন বিশাল এই বাড়িতে থাকার কেউ নেই, তাই একজন কেয়ারটেকার নিয়ে একাই থাকি।
চার প্রবাসী ছেলের মা রাজিয়া বেগম বলেন, ছেলেরা বিদেশে থাকে, ঘরে বাজার করে দেওয়ারও লোক নাই। কত দিন ছেলেদের মুখ দেখি না! একসময় শাক দিয়ে ভাত খাইতাম কিন্তু ছেলেরা পাশে ছিল। এখন বড় বাড়ি আছে, ভালো খাই কিন্তু মনে শান্তি নাই।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হলেও বিদেশমুখী প্রবণতা ব্যাপক বেড়েছে। জমি বিক্রি, ঋণ বা ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। দালালের প্রতারণায় কেউ নিঃস্ব হচ্ছেন, আবার কেউ ফিরছেন ঋণের বোঝা নিয়ে।
সদ্য প্রবাসে যাওয়া সিহাব মালতের মা শাহনাজ বেগম বলেন, অনেক কষ্টে ধারদেনা করে ছেলেকে রোমানিয়া হয়ে ইতালি পাঠিয়েছি। ও কাজ করে টাকা পাঠাচ্ছে, ধারদেনা শোধ করেছি। সামনে নতুন ঘর তোলার পরিকল্পনা আছে।
অন্যদিকে তরুণদের অতিমাত্রায় বিদেশমুখী প্রবণতায় পড়াশোনায় স্থবিরতা আসছে। স্থানীয় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিরব জানায়, সে পড়ালেখা ছেড়ে ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ের কাজ শিখছে, যাতে ইতালি গিয়ে কাজ পেতে সুবিধা হয়।
উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগের অভাবকেও বড় সংকট হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নড়িয়ায় বিলাসবহুল বাড়ি হলেও বড় শিল্পকারখানা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
শরীয়তপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফজলুল হক বলেন, অভিভাবকদের মানসিকতাই থাকে ছেলেকে বড় হলেই বিদেশে পাঠানো। ফলে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা পড়ালেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এতে কলেজে শিক্ষার্থী কমছে, ফলাফলেও প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি প্রবাসীরা কোটি কোটি টাকা বাড়ি বানাতে খরচ করলেও কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেন না, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।



