রূপসা ঘাটে টোল দ্বিগুণ হলেও ৬৮ লাখের রাজস্ব নামল ১৬ লাখে

খুলনার ব্যস্ততম রূপসা ঘাটে জনপ্রতি টোল এক টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা করা হলেও সরকারি রাজস্ব আদায় বরং কমেছে। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ঘাটটি পরিচালনার সময় বছরে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা রাজস্ব পেলেও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর নয় মাসে সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে মাত্র ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। অথচ সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এই ঘাট দিয়ে পারাপার করেন। ফলে টোল আদায়ের প্রকৃত পরিমাণ ও সরকারি রাজস্বের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিআইডব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঘাটটি বুঝে নেওয়ার পর মো. শেখ আলী আকবরকে মাসে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা হিসাবে খাস আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি টানা ৯ মাস ঘাট থেকে টোল আদায় করেন। এ হিসাবে ৯ মাসে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে প্রায় একই পরিমাণ অর্থ জমা পড়েছে।
ইজারাদার শেখ আলী আকবরের দাবি, তিনি এখন পর্যন্ত সরকারি কোষাগারে ১৪ লাখ ৭ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। ফলে সরকারি নথি ও ইজারাদারের বক্তব্যের মধ্যেও রয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার পার্থক্য।
শুধু পারাপারের টোল নয়, যাত্রীদের ব্যাগ ও মালামাল ঘাট পারাপার এবং নৌযানে ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ব্যাগ, বস্তা কিংবা অন্য কোনো মালামাল সঙ্গে থাকলে নির্ধারিত টোলের বাইরে বাড়তি টাকা দিতে হয়। টোল আদায়কারীদের দুর্ব্যবহার এবং ঘাটের পন্টুন ও গ্যাংওয়ের দুরবস্থা নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।
রূপসার পথচারী রেহানা বেগম বলেন, আগে রূপসা ঘাট পার হতে এক টাকা টোল দিতে হতো। এখন টোল বেড়ে দুই টাকা হয়েছে। এর সঙ্গে বড় ব্যাগ বা মালামাল থাকলে অতিরিক্ত টাকাও দিতে হয়। টোল আদায়কারীদের আচরণও অনেক সময় ভালো থাকে না। রূপসা ঘাট দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
যাত্রী মেহেবুবা বলেন, টোল বাড়ানো হলেও ঘাটের সেবার মান বাড়েনি। দুটি পল্টুনেরই অবস্থা খুবই নাজুক। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। টোল নিতেই হলে অন্তত ন্যূনতম সেবাটুকু নিশ্চিত করতে হবে।
ইজারাদারের অস্বীকার
অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে রূপসা ঘাটের ইজারাদার মো. শেখ আলী আকবর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘাটে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে এবং সেখানে ঘাটের সব কার্যক্রম রেকর্ড করা হয়। ব্যবসায়ীরা পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে কিছু টাকা দেন দাবি করে তিনি বলেন, ৪০ হাজার টাকার ওষুধ নিলে তাকে ২০ টাকা দেওয়া হয়। তার দাবি, খুলনার বাইরে থেকে আসা বিভিন্ন ব্যবসায়ীর ওষুধ, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন মালামালের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অর্থ দেওয়া হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে মামলা-মোকদ্দমা করে তিনি এসব টাকা আদায়ের অধিকার পেয়েছেন। তার ভাষ্য, সারা বাংলাদেশেই ঘাটে জনপ্রতি দুই টাকা করে টোল নেওয়া হয়।

ঘাটের ইজারা ও ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতের আদেশ থাকায় জেলা পরিষদ নতুন করে ঘাটের টেন্ডার দিতে পারে না। ঘাটের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার স্বার্থেই বর্তমান ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রূপসা ঘাটে সরেজমিনে গিয়ে কয়েকজন যাত্রী তাদের ভোগান্তির কথা জানান। তাদের অভিযোগ, প্রতিদিনের যাতায়াতের জন্য অপরিহার্য এই ঘাটের উন্নয়ন ও সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ টোলসহ বিভিন্ন নামে নিয়মিত টাকা আদায় করা হচ্ছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, হরিলুটের মতো অবস্থা সেখানে। একদিকে যাত্রীরা ট্রলার ভাড়া দিয়ে আসেন, আবার দুপাড়ে টোল দেন। সেটাও আবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। নৌকা ভাড়াও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আরেকটি বিষয় দুঃখজনক—মানুষের একটি ব্যাগ বা বোঝা তুললেই টাকা দিতে হবে, তারা শ্রমিকের কাজে লাগুক বা না লাগুক। পাশে জেলখানা ঘাট রয়েছে, সেখানে টোল দিতে হয় না; কিন্তু রূপসা ঘাটে টোল দিতে হয়।
৬ ঘাটের দায়িত্বও এক ইজারাদারের হাতে
এদিকে শুধু রূপসা ঘাট নয়, খুলনার আলোচিত ছয়টি ঘাটের দায়িত্বও প্রায় দুই বছর ধরে একজন ইজারাদারের হাতে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ খুলনা সূত্রে জানা গেছে, রূপসা ফেরিঘাট, কালীবাড়ী ফেরিঘাট, মহেশ্বরপাশা ফেরিঘাট, হার্ডবোর্ড-চন্দনীমহল ফেরিঘাট, ব্যারাকপুর ফেরিঘাট ও কাস্টমঘাট ফেরিঘাট—এই ৬ ঘাটের দায়িত্বে রয়েছেন মো. শেখ আলী আকবর। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ৫ আগস্টের পর কোটেশনের মাধ্যমে তাকে ঘাটগুলোর দায়িত্ব দেয় বিআইডব্লিউটিএ।
তবে এসব ঘাটের প্রকৃত আয় এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত দুই বছরে এসব ঘাট থেকে সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের তুলনায় নামমাত্র অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিআইডব্লিউটিএ কোটেশন ইজারা প্রথা বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঘাটগুলো ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ সময় নিজের লোকসানের কথা উল্লেখ করে ঠিকাদার শেখ আলী আকবর হাইকোর্টে পিটিশন করেন। ওই পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত স্থগিতাদেশ দেন। ফলে দরপত্র প্রক্রিয়া আটকে যায়। এরপর বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ৬টি ঘাটের জন্য ইজারামূল্য নির্ধারণ করে। এর মধ্যে রূপসা ঘাটের জন্য ৭৫ লাখ টাকা, কালীবাড়ী ঘাটে ৭ লাখ, মহেশ্বরপাশা ঘাটে ১৬ লাখ, হার্ডবোর্ড ও ব্যারাকপুর ঘাটে ৯ লাখ এবং কাস্টমঘাটে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ছয় ঘাটের জন্য মোট নির্ধারিত ইজারামূল্য দাঁড়ায় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া এগোয়নি। ফলে কোটেশন বা খাস আদায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির হাতে ঘাটগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার কারণে সরকার আর্থিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রূপসা ঘাটের ক্ষেত্রেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। কেসিসি যখন ঘাটটি পরিচালনা করত, তখন সর্বশেষ ইজারা মূল্য ছিল ৬৮ লাখ টাকা। এখন বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত ইজারামূল্য ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ইজারামূল্য বেড়েছে ৭ লাখ টাকা। অথচ জনপ্রতি টোল এক টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা করা হয়েছে। ফলে টোল আদায়ের প্রকৃত পরিমাণ, যাত্রীসংখ্যা এবং সরকারি রাজস্বের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ খুলনার উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি যোগ দেওয়ার আগে থেকেই ওই ঠিকাদার ঘাট চালাচ্ছেন। ঘাটটি বার্ষিক ইজারা দিতে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছি। ইজারাদার মামলা করে টেন্ডার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আমরা নতুন করে টেন্ডার নিতে গেলে আমাদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করেছে। বাস্তব কিছু সমস্যার কারণে অনেক কিছু করতে পারছি না।


