logo
Advertisement

লোডশেডিং বিপর্যয়ে নোয়াখালীতে বন্ধের মুখে ক্ষুদ্র শিল্প

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ
নোয়াখালী, চট্টগ্রাম
লোডশেডিং বিপর্যয়ে নোয়াখালীতে বন্ধের মুখে ক্ষুদ্র শিল্প
প্রতীকী ছবি

তীব্র গরমে নোয়াখালীতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সে অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় দিন-রাত লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম—প্রায় সব এলাকাতেই ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এতে একদিকে যেমন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানায় নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত সরবরাহ অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বণ্টন করা হচ্ছে।

জানা গেছে, জেলায় ৮ লাখ ২১ হাজার ২৯০ জন পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছেন। তাদের সেবা সরবরাহ এলাকায় পিক সময়ে ২১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে জেলা শহরের পিডিবি এলাকায় ৩৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সন্ধ্যার পর সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৯ মেগাওয়াট। ফলে কোথাও ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো ফিডারে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, এতে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ।

জেলা শহরের পিডিবি এলাকাতেও পরিস্থিতি বেশ সংকটপূর্ণ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো/পিডিবি) গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ১ লাখ। মাইজদী ও দত্তেরহাট সাবস্টেশনের আওতায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ৩২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১ থেকে ১৪ মেগাওয়াট। সন্ধ্যার পর চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ থাকে প্রায় ১৯ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শহরের অধিবাসীদের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার মানুষও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। কোথাও এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে শিশু ও প্রবীণদের কষ্ট চরম আকার ধারণ করেছে। একই সাথে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও।

নোয়াখালী শহরের পশ্চিম সাহাপুর এলাকার বাসিন্দা উম্মে কুলসুম বলেন, দিন যত যাচ্ছে লোডশেডিং তত বাড়ছে। বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎসংকটের কারণে ৩ মাস বয়সী বাচ্চাকে রাখা ভীষণ কষ্টকর, সন্তানদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে, গরমের কারণে তারা পড়ার টেবিলে বসতে চায় না।

সুবর্ণচর উপজেলার নেয়াজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিম ফারুকী জানান, গ্রামের পরিস্থিতি আরও নাজুক। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে থাকাকালীন সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান তারা। একবার বিদ্যুৎ গেলে এক ঘণ্টার আগে আসে না, আবার এলেও আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়।

বিদ্যুৎসংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তারা। হারিছ চৌধুরীর বাজারের একটি ফার্নিচার কারখানার মালিক মনজুর আলম জানান, সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কারখানা খোলা রাখলেও এর মধ্যে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। চারজন কর্মচারীকে দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়, অথচ কাজ বন্ধ থাকায় দিন শেষে সেই পরিমাণের উৎপাদন তোলা সম্ভব হয় না।

কবিরহাট বেকার্স ব্রেডের মালিক মো. জামাল ভূঁইয়া বলেন, সারাদিন বিদ্যুৎ আসে আর যায়, প্রায় এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। এতে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য পরিচালন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (সদর-কারিগরি) প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পিক আওয়ারে আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২১৭ মেগাওয়াট এবং অফ-পিক সময়ে ১৫০ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ফলে বাধ্য হয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

নোয়াখালী পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুল বাহার বলেন, মাইজদী ও দত্তেরহাট সাবস্টেশনের আওতায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ৩২ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১ থেকে ১৪ মেগাওয়াট। সন্ধ্যার পর চাহিদা বেড়ে ৩৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ থাকে মাত্র ১৯ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ফলে রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা ছাড়া উপায় থাকছে না।

পিডিবির এই নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত সরবরাহ অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। রেশনিংয়ের কারণে প্রতিটি ফিডার লাইনে দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোনো এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হচ্ছে।