
উত্তরের জনপদ গাইবান্ধায় শীতের আমেজ দেখা দিয়েছে। কৃষিনির্ভর এই জেলার গ্রামাঞ্চলে ভোরের সূর্যের আলোয় শিশির ঝিকমিক করছে। দূর্বাঘাসের ডগায় মুক্তার মতো জমে থাকা শিশির আর ধানক্ষেতের ঘাসফড়িংয়ের লুটোপুটি জানান দিচ্ছে, শীত দুয়ারে কড়া নাড়ছে। কবি-সাহিত্যিকেরা বলছেন, শীত মানেই খেজুরের রস ও পিঠার সঙ্গে ছোটবেলার স্মৃতি, শীত যেন কবিতারই প্রাণ।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাঙালি নদীর তীরে দূর্বাঘাসের ওপর জমে থাকা শিশির মনে করিয়ে দিচ্ছে, শীত এসে পড়েছে। একটু দূরে তাকালে হালকা কুয়াশায় ঢেকে থাকা প্রকৃতিও জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। শীতের আমেজ গ্রামীণ জনপদের মানুষের মনেও মনে করিয়ে দিচ্ছে, শীত দরজায় কড়া নাড়ছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কৃষক সাকা মিয়া বলেন, ভোররাতে হালকা শীত অনুভূত হয়। তাই কাঁথা-কম্বল গায়ে দিতে হয়। আগের মতো সবসময় বৈদ্যুতিক পাখা চালাতে হয় না। মনে হচ্ছে, শীত পড়েছে।
সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের আনিনুল ইসলাম বলেন, ভোরের আলোয় সূর্যের কিরণ মন ভরে দেয়। মনে হচ্ছে, শীত পড়েছে। এবার কৃষকের জন্য সুদিন, কারণ পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে।
সাঘাটা উপজেলার গাছাবাড়ী গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, আগে সারা দিন পাখা চালাতে হতো। এখন আর তেমন পাখা চালাতে হয় না। তাই বোঝা যাচ্ছে, শীত আসছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের নৌকাচালক কফিল উদ্দিন বলেন, ভোরে একটু শীত শীত অনুভূত হয়। আমরা ভোরে নৌকা চালাতে গিয়ে হালকা কুয়াশা দেখতে পাই। তাতে বোঝা যাচ্ছে, শীত আসছে।
তরুণ কবি ও লেখক জাহাঙ্গীর আলম আজাদ বলেন, ষড়ঋতুর বাংলাদেশে শীতের রয়েছে আলাদা মাহাত্ম্য। এ সময় বৃষ্টিপাত কমে যায়, আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে, সূর্যের উত্তাপ কমে। শীতের সকালে শিশির, ভেজা ঘাস, কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ ও মাঝে মাঝে মৃদু রোদের উপস্থিতি প্রকৃতিতে ভিন্ন সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। শীতকালীন সবজি, খেজুরের রস ও পিঠাপুলি উৎসবের আবহ তৈরি করলেও এ সময় দরিদ্র ও ছিন্নমূল শীতার্ত মানুষ এবং পশুপাখির জন্য তীব্র শীত কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আরও বলেন, শীতসকালের মনোরম দৃশ্য নান্দনিক ফটোসাংবাদিকের ক্যামেরায় যেমন বন্দি হয়, তেমনি কবি-সাহিত্যিকের জাদুকরি কলমে ও চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়েও সুনিপুণভাবে ফুটে ওঠে।
কবি ও লেখিকা কুমকুম খাতুন বলেন, শীত এলেই যেন চারপাশটা একটু অন্য রকম হয়ে যায়। ভোরের কুয়াশায় ঢাকা পথ, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা মিষ্টি রোদ, সবকিছুতেই মিশে থাকে এক অদ্ভুত ভালো লাগা। গরম চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতে থাকে, গায়ে জড়ানো থাকে প্রিয় চাদর, আর বিকেলের নরম রোদে বসে থাকতে ইচ্ছে করে অনেকক্ষণ।
তিনি বলেন, শীতের রাতগুলোও যেন একটু বেশি নীরব, একটু বেশি আবেগী। পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে, প্রিয় মানুষটির কথা মনে হয়, আর মনটা অকারণেই কেমন বিষণ্ন হয়ে যায়। শীত মানেই শুধু ঠান্ডা নয়, শীত মানে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া সকাল, রোদের উষ্ণতায় মিশে থাকা প্রশান্তি, চায়ের কাপে জমে থাকা আড্ডা এবং আপন মানুষদের আরও একটু কাছে পাওয়ার অজুহাত। শীত এমন এক ঋতু, যে ঠান্ডা নিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরটা উষ্ণ করে দিয়ে যায়।
জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধের আগে ও পরে আমরা শীতকে গ্রামীণ দাওয়াত ও উৎসব হিসেবে উপভোগ করতাম। কারণ তখন মা, খালা, চাচিরা রাতে চাল ভিজিয়ে রাখতেন। ফজরের আজানের সময় নামাজ পড়ে ঢেঁকিতে চাল কুরে আটা বানাতেন। সেই সময় শীতের আলাদা আমেজ ছিল।
প্রবীণ সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক গোবিন্দ লাল দাস বলেন, যখন ধানের আবাদ পরিপূর্ণ হয়ে মাঠজুড়ে ধানক্ষেত, ঠিক তখনই শীতের আমেজ কৃষিনির্ভর জেলার জন্য যেন আশীর্বাদ। আমরা ছোটবেলায় শীতের সকালে খেজুরের রস খেতাম এবং মায়ের হাতে তৈরি পিঠা-পায়েস খেতাম। পুরো শীতকালই ছিল আদর-আপ্যায়নের কাল।
তিনি বলেন, এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় শীতের সেই আমেজ নেই বললেই চলে। আগে পিঠা তৈরির জন্য আটা সংগ্রহ করতে ঢেঁকিতে চাল কুড়াতে হতো। এখন তো সবই মেশিনে হয়। ঢেঁকির ঠকঠক শব্দে গ্রামে ধুম পড়ে যেত, অমুকের বাড়িতে পিঠা তৈরি হবে। সবার নজর থাকত সেই বাড়ির দিকে।
