logo

দোকানে রাত কাটাচ্ছেন সেই প্রবাসী, বাড়িতে থাকতে পারছেন না বাবা-ছেলের কেউই

মিজানুর রহমান
ফেনী
দোকানে রাত কাটাচ্ছেন সেই প্রবাসী, বাড়িতে থাকতে পারছেন না বাবা-ছেলের কেউই
সৌদি ফেরত নজরুল ইসলাম রাব্বি। পুরোনো ছবি

ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নে বসতঘর দখল ও ঘরে প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে বাবা ও প্রবাসফেরত ছেলের মধ্যকার পারিবারিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। কুয়েত ফেরত বাবা জামাল হোসেন এবং তার সৌদি ফেরত ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বির পাল্টাপাল্টি অভিযোগে স্থানীয় বা প্রশাসনিক প্রচেষ্টায়ও এই সমস্যার সমাধান মেলেনি। বর্তমানে বাবা-ছেলে কেউ বাড়িতে অবস্থান করতে পারছেন না এবং প্রবাসফেরত ছেলে রাব্বি চাচার দোকানে রাত কাটাচ্ছেন।

সমঝোতা না হওয়ায় উভয় পক্ষকে পারিবারিক আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় পর্যায়ে মীমাংসা ও প্রশাসনিক প্রচেষ্টায় ও তাদের পারিবারিক সমস্যার সমাধান করতে মিটেনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী সদর উপজেলাধীন শর্শদী ইউনিয়নের দক্ষিণ খান গ্রামের বানানী পাড়ার বাসিন্দা দরবেশ আলীর ছেলে জামাল হোসেন কুয়েত প্রবাসী। তিনি প্রথম বিয়ের সংসারের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বি গত ২৮ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। তবে পারিবারিক কলহের কারণে দেশে এসে তিনি তার বাবার বাড়িতে উঠতে পারছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ জামাল বলেন, আমি দীর্ঘ ২২ বছর কুয়েত প্রবাসী। নজরুল ইসলাম রাব্বী আমার অবাধ্য সন্তান। সে ১৫ বছর বয়স থেকে জুয়া, নেশা, চুরি ও নারী সংক্রান্ত অসামাজিক কাজে লিপ্ত। তার যখনই টাকার প্রয়োজন হতো আমার কাছে চাইলে আমি দিয়েছি। না দিলে আমার গায়ে হাত তুলতো এবং মেরে ফেলার হুমকি দিতো। আমি তার জন্য ২০২০ সালে ফেনী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করি। বর্তমানে আমি যেই বসত ভিটায় থাকি এটা আমি আমার প্রবাস জীবনের ২২ বছরের সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে ২০১৫ সালে করেছি। ২০১৬ সালে তাকে বিদেশ নেই। ৩ মাস পর ওই কোম্পানি তার নামে মামলা দিয়ে দেয়। এরপর বিদেশেও সে খারাপ চক্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। পরে তাকে সাধারণ ক্ষমা দিলে সে দেশে চলে আসে। দেশে এসে আবার নেশা, জুয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়।

তিনি আর বলেন, এখন সে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করতেছে আমার এই ঘর-বাড়ি তার টাকায় গড়া! আমার প্রশ্ন আমি জায়গা কিনেছি ২০১৫ সালে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে আমার ঘর প্রস্তুত শেষ। তাহলে সে কিভাবে আমাকে টাকা দিল? ২০১৬ সালেই তাকে কুয়েতে নিয়েছিলাম আমি। আমি সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরে আসি। সে আমাকে আমার নিজের বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। আমি ৯ মাস রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। আমাকে মেরে ফেলবে এবং এসিড মেরে পুড়ে ফেলার হুমকি দেয়। আমার নিজের ক্রয়কৃত বাড়ি দখল করে রাখে। এরপর গত চলতি বছর আগস্টের ৬ তারিখে আমি আমার বাড়ি আইনের মাধ্যমে দখলমুক্ত করে ঘরে প্রবেশ করি। এখন সে আবার আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে এবং মিডিয়ার মাধ্যমে ভুয়া তথ্য প্রচার করে আমার জীবননাশের হুমকি এবং আমার সম্মানহানির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের নিকট সুবিচার কামনা করছি।

বাবার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাব্বি এশিয়া পোস্টকে বলেন, আজ দুই সপ্তাহ হতে চলল আমি এখনো ঘরে ঢুকতে পারিনি। এদিকে নানা দিক থেকে আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। ২০১৬ সালে প্রথমে কুয়েত গেছি। এরপর ২০১৯ সালে আবার সৌদি আরব গিয়েছি। সেখান থেকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছি। বাড়ি এসে দেখি আমার বাবার রুমটি তালা মারা। পাশের রুমটি ভাড়া দিয়ে রেখেছে যাতে আমি ঢুকতে না পারি। বাবাকে অনেকবার ফোন দিলাম তিনি আর আসেননি। উনি আমার মাকে তালাক দিয়েছেন। স্ত্রীকে তালাক দিলেও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কিভাবে অবিচার করতে পারেন। বাবা এবং আমি মিলেমিশে জায়গা কিনে ঘর করেছি। এখন শুনি আমি নাকি ওনার ছেলেই না। উনি আমাকে অস্বীকার করেছেন। ২৯ বয়সে এসে আমাকে এখন এসব কথা শুনতে হচ্ছে। শুনেছি উনি নাকি আমার বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছেন। জায়গা বিক্রি করার জন্য বাবা পায়তারা করছেন বলে শুনতে পারছি। এখন আমি আমার চাচা কামাল হোসেনের দোকানে রাতযাপন করি। আমি যেন আমার অধিকার ফিরে পেতে পারি এ বিষয়ের সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি আসলে একটি পারিবারিক কলহের ঘটনা। এ বিষয়ে মীমাংসার জন্য আমরা গত মঙ্গলবার সকালে বাবা-ছেলে দুইজনকেই থানায় ডেকেছিলাম। তারা স্থানীয়দের নিয়ে থানায় এসেছিলেন। উভয় পক্ষের বিস্তারিত আলোচনা শুনে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে কোনো পক্ষই রাজি হয়নি। পরে এই বিষয়ে তাদেরকে পারিবারিক আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান নাসরিন কান্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসক মহোদয় এর নিকট বিস্তারিত জানতে চেয়েছে। পরে জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করেন।আমি এ বিষয়ে স্থানীয় শর্শদি ইউনিয়ন পরিষদ এর মাধ্যমে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়েছি । এছাড়া তাদের পিতা পুত্রের সাথেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তাদের দু'জনকে মিটি ফেলার উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা উক্ত পারিবারিক বিরোধের কারনে বাবা ছেলে কেউ আমাদের সমঝোতা প্রচেষ্টায় রাজি হচ্ছে না। এ বিষয়ে থানা প্রশাসন থেকেও তাদেরকে ডেকে মিমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। পরে বিষয়টি তাদেরকে পারিবারিক আদালত মাধ্যমে সমাধানের জন্য থানা প্রশাসন থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।