logo

শিশু কলি হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল পুলিশ

রাকিব হাসনাত
পাবনা
শিশু কলি হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল পুলিশ
শিশু কামরুন্নাহার কলি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাবনার সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামের ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলি ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মোস্তফা প্রামাণিক রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাগরিবের নামাজের পরই শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয় এবং এর প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুটিকে খোঁজার নাটকেও অংশ নেন তিনি।

পুলিশ বলছে, ঘটনার পর রাত ১০টার দিকে মোস্তফা আবার তার মুদিদোকান খোলেন এবং রক্তমাখা শরীর নিয়ে গোসল করেন। রিমান্ডে তিনি ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। দুজন মিলে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছেন বলে পুলিশকে জানায়। তবে অপর আসামি ইয়াসিন আলী ধর্ষণ ও হত্যায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, হত্যার পর মোস্তফা তার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন এবং তিনি শুধু ওই কাজে সহযোগিতা করেছেন।

গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর নিখোঁজ হয় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় তার টুকরো টুকরো মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় মোস্তফা প্রামাণিক ও তার ভাড়াটিয়া ইয়াসিন আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই বেনু রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, লাশ উদ্ধারের দিনই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত দুজনকে শনাক্ত করা হয়। তাদের আটক করার সময় মোস্তফার আচরণেও পুলিশের সন্দেহ তৈরি হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর কয়েক দিন ধরে মোস্তফা নিহত শিশুটির বাবার সঙ্গে মিশে ছিলেন। কলির পরিবারের সঙ্গে গভীর রাতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কলির নিখোঁজের বিষয়ে খোঁজখবরও রাখতেন। এমনকি কলির সন্ধান ও বিচারের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ও মানববন্ধনেও তিনি অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া লাশ উদ্ধারের সময়ও সাংবাদিক ও পুলিশের পাশেই অবস্থান করছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

গ্রেপ্তার মোস্তফা প্রামাণিক। ছবি: এশিয়া পোস্ট
গ্রেপ্তার মোস্তফা প্রামাণিক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বেনু রায় আরও বলেন, ঘটনার দিন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে কলি তার ভাইকে নিয়ে মোস্তফার দোকানে চিপস কিনতে যায়। ওই সময় মোস্তফা তার মোবাইল ফোনে শিশুটির একাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গিতে ছবি তোলেন। পরে ফোনটি পরীক্ষা করে এসব ছবি উদ্ধার করা হয় বলে দাবি পুলিশের। এরপর সন্ধ্যার সময় স্থানীয় সাহেব আলীর ছেলের সঙ্গে মোস্তফার দোকানের সামনে কলি বসেছিল। পরে সাহেবের স্ত্রী খুশি খাতুন তার সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে চলে যান। এরপর মোস্তফা মাগরিবের নামাজ আদায় করতে যান। কলি তখন দোকানের সামনে বেঞ্চের ওপর বসা ছিল। নামাজ পরেই মুদিদোকানের পেছনের একটি কক্ষে নিয়ে কলিকে কয়েক দফা ধর্ষণ করেন মোস্তফা। এর ১৫ মিনিটের মধ্যেই তাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মোস্তফার মোবাইল ফোনে তার দোকানে আসা বিভিন্ন উদীয়মান বয়সের ছোট মেয়েরও আপত্তিকর ভঙ্গিতে তোলা অসংখ্য ছবি পাওয়া গেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে তার আগের আচরণ সম্পর্কেও তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে।

পুলিশ আরও জানায়, মামলার তদন্ত কাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন শুধু ডিজিটাল ফরেনসিকসহ কিছু পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া বাকি। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নিহত শিশুর সব আলামত রাজশাহী সিআইডিতে পাঠানো হবে। সেখান থেকে ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর বোঝা যাবে ধর্ষণের ঘটনায় দুজন জড়িত ছিলেন, নাকি একজন। এরপর দুই আসামির ফরেনসিক প্রতিবেদনও পরীক্ষা করা হবে।

বেনু রায়ের তথ্য অনুযায়ী, মোস্তফা বলছে, দুজন মিলে ধর্ষণ করেছে। আর ইয়াসিন বলছে, সে ধর্ষণ ও হত্যার কোনোটির সঙ্গেই জড়িত নয়; হত্যার পর মোস্তফা সহযোগিতা চেয়েছিল, তাই সে কিছুটা সহযোগিতা করেছে। ফরেনসিক প্রতিবেদনে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, কলিকে ফুসলিয়ে মোস্তফার মুদিদোকানের পেছনের একটি কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ বস্তাবন্দী করে গোপন করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু লাশের দুর্গন্ধ বের হওয়া ও কুকুর তাড়া করায় দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণে লাশ বাইরে নিতে পারেনি।

পরদিন লাশের দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা টের পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে টুকরো টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত ও ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণ প্রমাণ হয়। এরপর দুজনকে হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের কাছে ৫ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেও দ্রুত স্বীকার করায় রিমান্ড আগেই শেষ হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় গত তিনদিন ধরে আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বাড়িটি ভাঙচুর করেছেন উৎসুক জনতা। প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে মনবাসনা পূরণের কথা বলে বাড়িটি ভাঙতে আসছেন মানুষ।

এ ছাড়া সাত দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দাবিতে রোববার দুপুরে পাবনা আদালত ও ডিসি অফিস ঘেরাও করেন নিহতের স্বজন ও সাধারণ জনগণ। মামলায় কালক্ষেপণ হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।