রোদ-বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তায় শূন্যরেখায় ৬০ ঘণ্টা

কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইনচেষ্টার শিকার ৯ নারী, পুরুষ ও শিশু টানা প্রায় ৬০ ঘণ্টা আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মাথার ওপর নেই ছাদ, নেই নিরাপদ আশ্রয়। প্রচণ্ড রোদ, গরম আর খোলা আকাশের নিচেই কাটছে তাদের দিন-রাত। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে দুই শিশুসহ নারী সদস্যরা।
সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে পড়া এসব মানুষকে ঘিরে মানবিক উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যেও। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সীমান্তবাসীরাই তাদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করছেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকায় শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিজিবির পক্ষ থেকে আবারও পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিএসএফের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, গত রোববার (১৪ জুন) সকালে উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর মেইন পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকা দিয়ে ভারতের ঝালুরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একই সময়ে ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে আরও তিনজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয়দের বাধা এবং বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তে আটকে পড়া এসব নারী, পুরুষ ও শিশুর বিষয়টি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা উচিত। কারণ, প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার কংশেরকুল গ্রামে। কয়েক দিন আগে কাজের সন্ধানে দালালের মাধ্যমে তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। পরে বিএসএফ তাদের আটক করে সীমান্তে নিয়ে আসে।
সীমান্তের বাসিন্দা লিটন মিয়া বলেন, মানুষ হিসেবে তাদের কষ্ট দেখে বসে থাকা যায় না। আমরা খাবার আর পানি পৌঁছে দিচ্ছি। কিন্তু দুটি ছোট শিশু নিয়ে এভাবে রোদ-বৃষ্টি আর রাতের অন্ধকারে থাকা খুবই কষ্টের। দ্রুত একটা সমাধান হওয়া দরকার।
শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সোনা মিয়া বলেন, শুনেছি তারা বাংলাদেশের নাগরিক। মানবিক কারণে আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। শিশুসন্তান নিয়ে তারা খুব কষ্টে আছে। বিষয়টির দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে, গত রোববার দুপুরে সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে জরুরি পতাকা বৈঠক হয়। বাংলাদেশের পক্ষে জামালপুর ৩৫ বিজিবির দাঁতভাঙ্গা ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ঠাণ্ডু মিয়া এবং ভারতের ১৮৩ ব্যাটালিয়নের ঝালুরচর ক্যাম্পের ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার বিএসএফের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমাধান হয়নি। উভয় পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় শূন্যরেখায় আটকে পড়া ৯ জনের ভাগ্য এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে আছে।
জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, বিষয়টি আইনগতভাবে সমাধানের জন্য পতাকা বৈঠকের আহ্বান করা হয়েছে। তবে বিএসএফ এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি, যার কারণে সমাধান হচ্ছে না।