logo
Advertisement

বাগেরহাট/এক বছরেও শেষ হয়নি ব্রিজের কাজ, পড়ে আছে পাইল-নির্মাণসামগ্রী

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,বাগেরহাট
এক বছরেও শেষ হয়নি ব্রিজের কাজ, পড়ে আছে পাইল-নির্মাণসামগ্রী
লক্ষ্মীখালী খালের ওপর নির্মিত জরাজীর্ণ কাঠের পোল ও অবহেলায় পড়ে থাকা পাইল-নির্মাণসামগ্রী। ছবি : এশিয়া পোস্ট

বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীখালী খালের ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজের কাজ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। পাইলিং শুরুর পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায়, জরাজীর্ণ একটি কাঠের পোলই এখন দুই উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। ঝুঁকিপূর্ণ এই পোল পার হতে গিয়ে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিশু, নারী, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা।

Advertisement

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দাবির মুখে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজ শুরুর কিছুদিন পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় ব্রিজ নির্মাণ এলাকাটি এখন পরিত্যক্ত জায়গায় পরিণত হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে নির্মাণকাজের মেশিন, পাইপ, বালু ও শ্রমিকদের অস্থায়ী থাকার ঘর। বছরের পর বছর সরঞ্জাম পড়ে থাকলেও ব্রিজ নির্মাণের কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করে নিয়েছে। তারা প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, বিল পরিশোধ ও সরকারি অর্থ খরচের বিষয়গুলো সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে বিল উত্তোলনের এ অভিযোগের বিপরীতে স্বতন্ত্র কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা জানান, খালের ওপর থাকা পুরোনো কাঠের পোলটি দীর্ঘদিন ধরে বেশ জরাজীর্ণ। কোথাও কাঠ ভেঙে গেছে, আবার কোথাও পোলের অংশ দেবে গেছে। বর্ষায় সংযোগ সড়ক পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় দুর্ঘটনা ও ঝুঁকি আরও বাড়ে। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পোল পার হচ্ছেন।

বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার মানুষের সরাসরি যোগাযোগের জন্য লক্ষ্মীখালী ব্রিজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাট-বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য ১০টি গ্রামের মানুষ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ব্রিজটি না থাকায় বিকল্প হিসেবে তাদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময়ের পাশাপাশি পরিবহন খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীখালী খালের ওপর স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান শেষে ২০২৪ সালের শেষ দিকে নিশীথ বসু নামে এক ঠিকাদারকে কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪ হাজার ২১ টাকা ব্যয়ের এই ব্রিজের কাজ চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের ১২ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল।

তবে স্থানীয়দের দাবি, পাইলিং কাজ শুরু হওয়ার পর গত বছরের ৩ নভেম্বর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর কোনো দৃশ্যমান কাজ করেনি। একপর্যায়ে লোড টেস্টের পর কয়েকটি পাইল দেবে গেলে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা নারায়ন মজুমদার বলেন, ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে আছে। লোড টেস্টের সময় পাইলগুলো দেবে যাওয়ার পর থেকে ঠিকাদারকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মানববন্ধন করেছি, এলজিইডির প্রকৌশলীদের বিষয়টি জানিয়েছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।

প্রণব মন্ডল নামের অপর এক বাসিন্দা জানান, জরাজীর্ণ কাঠের পোলটি মাঝেমধ্যেই ভেঙে যায় এবং তা আবার মেরামত করে চলতে হয়। মোটরসাইকেল ও ভ্যান চলার সময় বড় সমস্যা হয়। ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময় ভয় পায়, অনেক সময় হাত ধরে পার করে দিতে হয়।

এ বিষয়ে বাসিন্দা খান টুকু বলেন, কাঠের পোল দিয়ে যাতায়াত করা খুব কষ্টকর। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশু ও বৃদ্ধরা। যেকোনো সময় ফাঁকে পা ঢুকে বা খালের স্রোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

পূর্ব সায়রা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, এখানে আগে একটি ঢালাই ব্রিজ ছিল। সেটি ভেঙে নতুন ব্রিজের কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। কাঠের পোলের মাঝখানের অংশ ভেঙে এক বাচ্চা পড়ে গিয়েছিল, সৌভাগ্যবশত এক মহিলা ধরে ফেলায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।

তিনি আরও জানান, দুই উপজেলার বাজার, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য বারাকপুরে নিয়ে বিক্রির জন্য এটাই সরাসরি পথ। বিকল্প পথে ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে অতিরিক্ত সময় ও ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকা এবং প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার আল আমিন বলেন, বৃষ্টির কারণে আপাতত কাজ বন্ধ আছে। যাতায়াতের রাস্তা ভালো না থাকায় মালামাল নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে খুব দ্রুতই কাজটি সম্পন্ন করা হবে।

বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনজুর রশিদ জানান, লক্ষ্মীখালী ব্রিজ নির্মাণের জন্য নিশীথ বসুকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা করেনি।

তিনি বলেন, ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং নতুন করে দ্রুত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিষয় :