ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার আইনি নোটিশ

গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি নীতিমালা ঘিরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রচলিত বিষয়ভিত্তিক (ডিসিপ্লিন-বেজড) পদোন্নতি ব্যবস্থা বহাল রাখার দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এতে বিদ্যমান নীতিমালা উপেক্ষা করে ভিন্ন পদ্ধতিতে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ব্রি উদ্ভিত প্রজনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহা. রফিকুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী কল্যান কুমার সাহা ওই নোটিশ করেন।
এতে বিবাদী করা হয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ ১৩ জনকে।
আইনি নোটিশ সূত্রে জানা গেছে, ব্রি-তে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি দেওয়া হয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা এবং গবেষণাভিত্তিক বিশেষায়নের সমন্বয়ে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রমও বিভাগভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই ব্রি দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। সম্প্রতি ‘এন্টিডেটেড সিনিয়রিটি’ বা পশ্চাদ-তারিখ ভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের একটি অংশের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান গবেষণা কাঠামো ও জনবল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আইনজীবী কল্যাণ কুমার সাহার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পদোন্নতি পদ্ধতি বিদ্যমান নীতিমালা ও নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) প্রণীত অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হতে হবে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার সমন্বয়ে। তা অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে। শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ নেই।
একইভাবে, ব্রি প্রবিধানমালা ২০১১ (সংশোধিত ২০১৯)-এও বিভাগভিত্তিক কাঠামোর মধ্যেই নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে। ফলে এই কাঠামো উপেক্ষা করে কোনো পদোন্নতি দেওয়া হলে তা নিয়মবহির্ভূত হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ডিভিশনের বাইরে পদোন্নতি স্থগিত থাকলেও ডিভিশনের ভেতরে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই বিদ্যমান নীতিমালা ও কাঠামো অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই রায়ের আংশিক ব্যাখ্যা দিয়ে বিভাগ-ভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে বিষয়ভিত্তিক কাঠামোকে পাশ কাটানোর শামিল।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের দাবি, ব্রির প্রশাসনিক বাস্তবতায় পদ সৃষ্টি, দায়িত্ব বণ্টন এবং গবেষণা কার্যক্রম–সবকিছুই বিভাগভিত্তিকভাবে পরিচালিত হয়। ফলে পদোন্নতিও একই কাঠামো অনুসরণ করা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়। অন্যথায় গবেষণার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
আইনি নোটিশে আরও সতর্ক করা হয়েছে, নীতিমালা লঙ্ঘন করে বা বিতর্কিত পদ্ধতিতে কোনো পদোন্নতি প্রদান করা হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি, মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বর্তাবে। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ব্রি’র বর্তমান মহাপরিচালক অবসরে যাওয়ার (এলপিআর) আগে শেষ সময়ে একটি মহলের প্রভাবে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে নেওয়া হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের পরিপন্থী হবে।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) উদ্ভিত প্রজনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্রির মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা বহাল রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক কৃষি গবেষণা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচকভাবে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান জানান, এমনভাবে পদোন্নতি হয়েছে কি না বা হয় কি না আমার জানা নেই। তিনি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন ধারণার উপর ভিত্তি করে।