logo

চুরি হওয়া গরু ফিরে পেতে ‘মুক্তিপণ’, তবুও মিলছে না খোঁজ

চুরি হওয়া গরু ফিরে পেতে ‘মুক্তিপণ’, তবুও মিলছে না খোঁজ
ছবি : এশিয়া পোস্ট

রাত তখন গভীর। চারদিকে নিস্তব্ধতা। গোয়ালঘরে বাঁধা ছিল সংসারের শেষ সম্বল গরুটি। সকালে ঘুম থেকে উঠে গোয়ালঘর ফাঁকা দেখে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে মেলান্দহ উপজেলার মধ্য ঝাউগড়া গ্রামের হতদরিদ্র কাঠমিস্ত্রি হেলাল উদ্দিনের।

হেলাল উদ্দিনের ছোট সংসার। তিন সন্তান আর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে কষ্টের জীবন। অনেক কষ্টে জমানো টাকা আর স্ত্রীর বাবার বাড়ির সম্পত্তির ভাগের অর্থ দিয়ে কিনেছিলেন দুটি গরু। একটিকে আগেই বিক্রি করতে হয়েছিল স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে। বাকি একটি গরু ছিল সংসারের শেষ আশা। কিন্তু গত ২৯ এপ্রিল রাতেই সেই গরুটিও নিয়ে যায় চোর। গরু হারিয়ে হেলাল যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই আসে এক ফোনকল।

ওপাশ থেকে একজন বলেন, গরু ফেরত চাইলে টাকা লাগবে। টাকা দিলেই ফিরে পাবেন তার গরু। শেষ সম্বল ফিরে পাওয়ার আশায় সবকিছু বিশ্বাস করতে বাধ্য হন হেলাল। পাশের এলাকার শামিম নামে এক ব্যক্তির কথামতো গাড়ি ভাড়াসহ নানা খরচের কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৬ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও ফেরেনি গরু। বন্ধ হয়ে যায় সেই ফোন নম্বরও।

এ সময় কথা হয় হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, চোরে ফোন দিয়ে বলল যে, গরুটা আমার এখানে আছে। আমার (চোরের ওস্তাদ) ওস্তাদের সঙ্গে আলাপ করছি। ওস্তাদও কইছে যে, গরিব মানুষ, কালকে দিয়া দিছ। তুই আমার মাঠে কাজ করিস আমি গরুটা ফিরিয়ে দিমু। আরগুলি না দিলে তোরটা দিয়ে দিমু। এইগুলো ফোনে আমারে বলছে। চিন্তা করেন না আপনি নিশ্চিত থাকেন, আপনি গরু পাবেন। এভাবে বলতে বলতে আজকে আমার ১৫ দিন ধরে ঘুরাইতাছে। আমারে আর গরু দেয় নাই। আমার সঙ্গে আর মোবাইলে কোনো যোগাযোগ করে না। গরুও গেল, সঙ্গে ৬ হাজার টাকাও গেল। আবার ফোন দিয়ে বলে গরু কিনে দিমু, আরও টাকা নিল। পরে আরও ৮০০ টাকা। নেওয়ার পরে আমি মনে করছি আমার আত্মীয়-স্বজন, যদি ওনারা নিয়ে থাকতো তাহলে তো দিয়ে দিতো, ভালো হতো কিন্তু দিল না।

শুধু হেলাল নন, একই রাতে ওই গ্রাম থেকেই একে একে ১৩ গরু চুরি হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের একজন রুবেল মিয়া। বড় দুই মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে লালনপালন করছিলেন চার গরু। সকালে গোয়ালঘর খালি দেখে যেন সব স্বপ্ন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।

রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমার চারটা গরু ছিল, কৃষিকাজ করি। এই গরু রাতে চোরে নিয়ে গেছে গোয়ালঘর ভাইঙ্গা। এখন ঘরে আইলে মনের মধ্যে বুক ফাইটা কান্না আসে। এখন চলার মতন কোনো পথ নাই। স্বপ্ন ডাই ভাইঙ্গা চুরমার করে দিছে। এখন খুঁইজাও পাওয়া যাইতাছে না।’

মো. সালাম বলেন, ‘আমার গরু পাঁচটা। এর মধ্যে তিনটা নিয়ে গেছেগা। আমার গরুই সম্বল। আমাগো গৃহস্থ মানুষের গরুই সম্বল। গরু যদি নিয়ে লয় গা, আমরা কী করে খামু? আমরা তো চাকরি-বাকরিও করি না। এই গরু দিয়েই সবকিছু আমাগো। চোরেরা এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি বা কিছু চাইও নাই। এখন তো চলার মতো শক্তি নাই। গরুই তো আছিল সবকিছু আমাদের।’

একই অবস্থা জামালপুর পৌরসভার লাঙ্গলজোড়া এলাকার মানিক মিয়ার। তার দুইটি গরু (গাভি ও বাছুর) নিয়ে গেছে চোর।

মানিক মিয়ার স্ত্রী ফজিলা বেগম বলেন, ‘আমরা গরুর ওপরেই নির্ভরশীল। এই গরু দিয়ে আমার দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাই। সারারাত গরু পাহারা দিই, ঘুমাই না। ঘুমানোর আগে, ৪টার সময় আমি গরু দেখে ঘুমিয়েছি। ঘুম থেকে উঠে সকালবেলা বাচ্চাদের ডেকে তুলেছি। উঠে দেখে যে গরুর ঘরের দরজা খোলা। পরে আমার স্বামীকে ডাক দিলাম। গোয়ালঘরের দরজা খুলে দেখে যে গরু দুইটা নাই।

গাভিটা প্রতিদিন ১০ কেজি করে দুধ দিত। তা দিয়েই দুইটা সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চলত। এই গরু দুইটা চুরি হওয়াতে নিঃস্ব হয়ে গেলাম, এখন আমরা কীভাবে চলব? আমি তো কোনো রাস্তা দেখতেছি না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, চর চক্রটি প্রথমে পরিকল্পিতভাবে গরু চুরি করে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে মালিকের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করে। গরু অন্যত্র সরিয়ে রেখে মুক্তিপণের মতো টাকা দাবি করে। কেউ কেউ গরু ফিরে পাওয়ার আশায় টাকা দিলেও মিলছে না কোনো গরু, পাওয়া যাচ্ছে না অভিযুক্তদেরও।

এদিকে মাদারগঞ্জ উপজেলায় ও গত ১৬ মে ভোরে উপজেলার পৃথক দুটি গ্রামে দুই কৃষকের গোয়ালঘর থেকে ৮টি গরু চুরি করে নিয়ে গেছে চোর চক্র।

বালিজুড়ি ইউনিয়নের পূর্ব সুখনগরী গ্রামের কৃষক মনির হোসেনের গোয়ালঘর থেকে ৫টি গরু এবং পৌর এলাকার বাণিকুঞ্জ গ্রামের কৃষক শাহ আলীর ৩টি গরু চুরি হয়েছে। সকালে গোয়ালঘরের দরজা খোলা দেখে চুরির বিষয়টি নিশ্চিত হন তারা।

ভুক্তভোগীদের অনেকেই থানায় অভিযোগ করছেন না। কারণ, তাদের বিশ্বাস অভিযোগ করলে হয়তো তারা তাদের গরুটি ফেরত পাবেন না। এদিকে জেলার সাতটি থানায় গত তিন মাসে ৪টি মামলা হয়েছে। আসলে নথিভুক্ত ছাড়া রয়েছে অসংখ্য চুরির ঘটনা।

প্রশাসনের দাবি, গরু চুরি প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গরু চুরি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রিইম এন্ড অপারেশন) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, ঈদের আগে গরু চুরির প্রবণতা বেড়েছে। গরু চুরি রোধে আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছি। জেলার প্রত্যেক উপজেলার সঙ্গে যে কানেক্টিং সড়কগুলো আছে এবং জামালপুর জেলা থেকে পাশের জেলার যে সড়কগুলো আছে, সেগুলোতে আমরা চেকপোস্ট বসিয়েছি। প্রতি রাতেই তারা চেক করে এবং যারা গরু চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের তথ্যগুলো আমরা নিয়েছি এবং সেসব চোরকে আমরা আমাদের নজরদারিতে রেখেছি। স্থানীয় লোকজন ও চৌকিদারদের নিয়েও পাহারা বৃদ্ধি করা হয়েছে।