কুমিল্লার ছাদবাগানে বিরল ‘চারাপিতা’ মরিচ

কুমিল্লা নগরীর ছোট পরিসরের কয়েকটি ছাদবাগানে এখন দেখা মিলছে এক ব্যতিক্রমী মরিচ, যার নাম ‘চারাপিতা’। সাধারণ মরিচের তুলনায় দেখতে যেমন ভিন্ন, তেমনি এর দাম নিয়েও রয়েছে চমকপ্রদ তথ্য। চাষিদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এই মরিচের দাম প্রতি কেজি প্রায় ২৬ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২৮ লাখ টাকা)। তবে স্থানীয় বাজারে এর প্রকৃত দাম নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কৃষি গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে এই মরিচ চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
কুমিল্লা নগরীর দেশওয়ালী পট্টি এলাকার কয়েকটি বাসায় শখের বশে চারাপিতা মরিচের চাষ হচ্ছে। কোথাও বালতিতে, আবার কোথাও ছোট মাচায় লাগানো হয়েছে গাছ। কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকলেও পাকলে মরিচগুলো হলুদ কিংবা উজ্জ্বল কমলা রঙ ধারণ করে। ছোট গোলাকার এই মরিচের গন্ধও বেশ আলাদা বলে জানান শখের চাষিরা।
কুমিল্লায় চারাপিতা মরিচের চাষ প্রথম শুরু করেন কৃষক আহমেদ জামিল সেলিম। তিনি জানান, ২০২২ সালে নগরীর ঠাকুরপাড়ার বাগানবাড়িতে তিনি প্রথম এই মরিচ চাষ করেন। তবে এর বীজ সংগ্রহ ও চাষের চেষ্টা শুরু করেছিলেন তারও কয়েক বছর আগে। জামিল জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা বীজ দিয়ে তিনি প্রথম পরীক্ষা চালান। শুরুতে ৫০টি বীজের মধ্যে মাত্র তিনটি চারা টিকেছিল। তার দাবি, একটি গাছ থেকে টানা কয়েক বছর ধরে মরিচ পাওয়া সম্ভব। দেশে এই মরিচের বাজার তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য এটি বেশ লাভজনক ফসল হতে পারে।
দেশওয়ালী পট্টির বাসিন্দা কাজী শারমিন আক্তারও এখন চারাপিতা মরিচ চাষ করছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পাকা মরিচ সংগ্রহ করে সেখান থেকে বীজ তৈরি করেন। পরে ৬টি চারা পান।
শারমিন জানান, প্রতিটি মরিচে ১৫ থেকে ২০টি বীজ থাকে। বর্তমানে তার গাছে বেশ ভালো ফলন হয়েছে। শখের চাষ হলেও তিনি প্রতিটি মরিচ ১০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তার বোনও নগরীর রানীর দিঘির পাড় এলাকায় একই মরিচ চাষ করছেন বলে জানান তিনি।
কৃষি সংগঠক মতিন সৈকতের মতে, দেশের আবহাওয়ায় এমন এক বিরল বিদেশি মরিচের ফলন পাওয়া কৃষির জন্য ইতিবাচক। তবে কেবল চড়া দামের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্যিক চাষে নামার আগে এর উৎপাদনক্ষমতা ও বাজার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা দরকার। এটি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যাবে কি না কিংবা ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কুমিল্লা সরেজমিন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, কুমিল্লায় আহমেদ জামিল সেলিমই প্রথম এই মরিচের চাষ শুরু করেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় মরিচটিকে দুর্লভ জাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এর প্রকৃত বাজারমূল্য কত, সে বিষয়ে আমাদের কাছে এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটিতে চারাপিতা মরিচ কতটা উপযোগী, তা নিয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। মূল উৎপত্তিস্থল পেরুতে উৎপাদিত মরিচের সঙ্গে কুমিল্লায় উৎপাদিত মরিচের জাতগত মিল আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া দরকার। গবেষণায় ফলন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সন্তোষজনক প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ে এর চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।



