সংকটে জঙ্গল সলিমপুরের একমাত্র স্কুল, অনিশ্চয়তায় ৮৭৮ শিক্ষার্থী

আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
সংকটে জঙ্গল সলিমপুরের একমাত্র স্কুল, অনিশ্চয়তায় ৮৭৮ শিক্ষার্থী
জঙ্গল সলিমপুরের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় প্রশাসনের বিশেষ অভিযানের পর সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চরম সংকটে পড়েছে ওই অঞ্চলের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়’। স্থানীয় সমবায় সমিতির অর্থায়নে পরিচালিত এই অবৈতনিক বিদ্যালয়টির ১২ জন শিক্ষকের বেতন গত তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।

Advertisement

সম্প্রতি প্রশাসনের অভিযানের মুখে সমিতির নেতারা গা-ঢাকা দিলে চাঁদা তোলা বন্ধ হয়ে যায়, যার কারণে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে বেতন বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

কেমন চলছে স্কুল?

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, সন্দ্বীপ ও হাতিয়াসহ উত্তরবঙ্গের নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা থেকে আসা প্রায় ১০ হাজার পরিবারের ৪০ হাজার মানুষের বসবাস এই আলীনগরে। কিন্তু শহরের খুব কাছে থেকেও এখানকার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের মতো মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। একপর্যায়ে নিজেদের উদ্যোগেই সন্তানদের শিক্ষার আলো ছড়াতে ২০০৬ সালে ৮৩ শতক জায়গায় আটটি টিনের ঘর দিয়ে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়।

বর্তমানে সম্পূর্ণ অবৈতনিক এই বিদ্যালয়ে ৮৭৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যার মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ৪৭৫। ২০২০ সালে প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই স্কুলের পাসের হার ছিল শতভাগ। গত বছর ২৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ২৪ জন, যাদের মধ্যে দুজন বৃত্তিও পেয়েছিল। এমনকি ২০২২ সালে টানা ৯ মাস বিদ্যুৎহীন থাকার পরও ২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৫ জন পাস করে। গত পাঁচ বছরে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ১২৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ১১৩ জন।

বর্তমানে প্রাথমিক শাখার অনুমোদন থাকলেও মাধ্যমিক স্তরের নিবন্ধনের আবেদনটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আপাতত শীতলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অধীনে এখানকার শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক নীরব হোসেন বলেন, বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙনের শিকার লোকজন এই জঙ্গলে বসবাস শুরু করে। অন্যান্য এলাকার গরিব ভূমিহীনরাও আসে। পরে এলাকাটি বাসযোগ্য হওয়ার পর আরও অনেকে আসতে শুরু করে। তবে শুরুর দিকে এখানকার জীবন সহজ ছিল না। শহরের পাশে হলেও এখানে একটা ভালো রাস্তা ছিল না, হাসপাতাল ও কোনো স্কুলও ছিল না। একপর্যায়ে সমিতির সহযোগিতায় ধীরে ধীরে সব গড়ে তোলা হয়েছে।

গত তিন মাস ধরে এই অবৈতনিক বিদ্যালয়টির ১২ জন শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট
গত তিন মাস ধরে এই অবৈতনিক বিদ্যালয়টির ১২ জন শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

তিনি আরও বলেন, চরম দুর্ভোগের মধ্যেও ২০০৬ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হয়। তখন এখানে রাস্তাঘাট কিছুই ছিল না। ফৌজদারহাট থেকে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে আসতে হতো। সেই সময়ে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে এখানে চাকরি নিই। এটা শুধু একটা চাকরি ছিল না, ছিল একটা স্বপ্ন।

‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে অভিযানে গিয়ে র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর নতুন করে ফের আলোচনায় আসে এলাকাটি।

কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গত ১৯ জানুয়ারি গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে র‍্যাবের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত র‍্যাবের সদস্যরাই সেখানে হামলার শিকার হয়ে ফেরত চলে আসেন। হামলায় র‍্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহতও হন।

এমনকি গত মাসে গভীর রাতে র‍্যাবের ক্যাম্পে (চৌকি) অতর্কিতে গুলি ছোড়া হয়। এরপর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে ঘটনাস্থলে অভিযান চালাতে না পারেন, সেই লক্ষ্যে অন্তত তিনটি স্থানে কেটে দেওয়া হয় রাস্তা।

গত তিন মাস ধরে আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন কিছু কক্ষে ক্যাম্প করেছে পুলিশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট
গত তিন মাস ধরে আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন কিছু কক্ষে ক্যাম্প করেছে পুলিশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীরা পুরোনো অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। জঙ্গল সলিমপুরকে আমরা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র হতে দেখেছি। সেখানে তারা যে ঔদ্ধত্য আচরণ করেছে, দুঃসাহস দেখিয়েছে, সেটা খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

অভিযানের মুখে বন্ধ বেতন, মেলেনি সরকারি সহায়তা

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত তিন মাস ধরে এই স্কুলের নির্মাণাধীন কিছু কক্ষে ক্যাম্প করেছে পুলিশ। অন্য পাশের টিনশেড ভবনে চলছে পাঠদান। আলীনগর এলাকায় প্রশাসনের বিশেষ তৎপরতা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। তারই অংশ হিসেবে এখানে পুলিশ ক্যাম্প ও পাঠদান চলছে একসঙ্গে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. নীরব হোসেন বলেন, আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতির সদস্যরা প্রতি মাসে ৫০ টাকা করে চাঁদা দেন, তা দিয়েই স্কুলের খরচ ও শিক্ষকদের বেতন চলত। সম্প্রতি প্রশাসনের অভিযানের মুখে সমিতির নেতারা গা-ঢাকা দিলে চাঁদা তোলা বন্ধ হয়ে যায়, আর সে কারণেই গত তিন মাস ধরে শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সমিতির নেতাদের কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের একটা অফিস আছে, সেটিও বন্ধ। অনেক কষ্টে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তিনি বললেন, অফিস বন্ধ থাকায় টাকা দেওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যেই আমরা কষ্ট করে চালিয়ে নিচ্ছি। প্রশাসন কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল পরিচালনায় কোনো ধরনের সহযোগিতা পাননি বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসকের আশ্বাস

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, স্কুলে বাচ্চারা লেখাপড়া করছে, স্কুল স্কুলের মতোই চলবে। সেখানে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।

শিক্ষকদের ৩ মাস ধরে বেতন বন্ধ থাকার বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক এই বিষয়ে আগে অবহিত করেননি। তবে তিনি দ্রুতই এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।