Advertisement

সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা: পরিবার নিয়ে দিশেহারা বনজীবীরা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খুলনা
সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা: পরিবার নিয়ে দিশেহারা বনজীবীরা
সুন্দরবন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ভোরে নদীর পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার মঠবাড়ি গ্রামের লিটন সরদার। টানা দুই দশক ধরে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালান তিনি। তবে সরকারের জারি করা তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণে তার ডিঙি নৌকাটি কাদা-জলে বাঁধা পড়ে আছে। কাজ নেই, জমানো সঞ্চয়ও শেষ। পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়াই এখন তার প্রধান লড়াই।

Advertisement

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস বনে সব ধরনের প্রবেশ ও সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। পরিবেশ রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত জরুরি হলেও উপকূলীয় কয়রা উপজেলার প্রায় ১২ হাজার বননির্ভর জেলে ও বাওয়ালি পরিবারের জীবনে তা তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী, ৪ নম্বর কয়রা, ৫ নম্বর কয়রা, ৬ নম্বর কয়রা, মঠবাড়ি, মহেশ্বরীপুর ও বানিয়াখালী গ্রামগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় সর্বত্রই একই করুণ চিত্র। নদী ও বনসংলগ্ন এলাকার অধিকাংশ পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষেরা এখন সম্পূর্ণ কর্মহীন।

সুন্দরবন বন্ধ থাকার এ সময়ে উপকূলজুড়ে চলছে বর্ষা মৌসুম। ফলে এলাকায় দিনমজুরি বা কৃষিকাজের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। বিকল্প আয়ের পথ বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দিশেহারা বনজীবীরা।

নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে মঠবাড়ি গ্রামের লিটন সরদার বলেন, আমরা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ তিন মাস বন বন্ধ করে দিলে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বন্ধের সময় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বাচ্চাদের মুখে খাবার দিতে হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়রার প্রায় ১২ হাজার বননির্ভর মানুষের একটি বড় অংশই এখনও সরকারিভাবে নিবন্ধিত হতে পারেননি। ফলে সরকারের চাল বা খাদ্যসহায়তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এই সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলো।

সামাজিক এ সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় শিক্ষক মেসবাহউদ্দিন বলেন, সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় বনজীবীদের রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। কিন্তু এ সময়েও এনজিওর কিস্তি আদায় এবং মহাজনদের চড়া সুদের তাগাদা থেমে নেই। বাজারে চাল-ডালের আকাশছোঁয়া দামের মধ্যে কিস্তি শোধ করতে গিয়ে মানুষগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এই তিন মাস কিস্তি আদায় সাময়িক বন্ধ রাখা এবং বাদ পড়া জেলেদের দ্রুত সরকারি তালিকার আওতায় আনা।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের সুরক্ষায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা একটি প্রশংসনীয় ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ। তবে কয়রার ১২ হাজার জেলে-বাওয়ালির বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করলে মানবিক বিপর্যয় ঘটে। প্রতিটি প্রকৃত বনজীবীর ঘরে পর্যাপ্ত খাদ্য পৌঁছে দেওয়া এবং এনজিওর কিস্তি আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা এখন সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, শুধু খাদ্য সাহায্য দিয়ে সংকট দূর করা সম্ভব নয়। এই নিষেধাজ্ঞা ও বর্ষা মৌসুমে বিকল্প কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করে বনজীবীদের জন্য বিকল্প আয়ের সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করা জরুরি।

প্রকৃতি বাঁচার পাশাপাশি তার ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো যেন টিকে থাকতে পারে—কয়রার সাধারণ বনজীবীরা এখন সরকার ও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।

কয়রা উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার বলেন, সুন্দরবনে তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণে জীবিকা হারানো বনজীবীদের সহায়তায় সরকারের বিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চলতি বছর বন বিভাগের নিবন্ধিত ২ হাজার ৮২ জন বনজীবীকে জনপ্রতি ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ খাদ্যসহায়তা বনজীবী পরিবারগুলোর সাময়িক খাদ্যসংকট কিছুটা লাঘব করতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো বন ও বন্যপ্রাণীকে একটি নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ তৈরি করে প্রজননের সুযোগ দেওয়া। বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের গাছপালায় নতুন কুঁড়ি ও চারা গজায়, যা বন পুনর্জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে মাছ, কাঁকড়া, চিংড়িসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী এবং হরিণ ও বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বংশবিস্তারের সময় চলে।

এ সময়ে মানুষের প্রবেশ, নৌযান চলাচল ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকায় প্রাণিকুল নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে পারে এবং নবীন উদ্ভিদও বাধাহীনভাবে বেড়ে ওঠে। ফলে বন তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়।

এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বনজীবীদের জন্য কিছুটা কষ্টকর হলেও সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই অনন্য ম্যানগ্রোভ বন টিকিয়ে রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই।

বিষয় :