
দুর্গাপূজাকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পিরোজপুরের ৪৬২টি পূজামণ্ডপের আয়োজকেরা। জেলার সাতটি উপজেলার এসব মণ্ডপে কয়েক হাজার কারিগর ও শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ রাজমন্দিরের ১৬০টি প্রতিমা।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিসাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের রাজমন্দিরে আয়োজকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে প্যান্ডেল, প্রতিমা, আলপনা ও সাজসজ্জার কাজ। আয়োজকদের দাবি, এবার দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় দুর্গাপূজার আয়োজন হতে যাচ্ছে এখানে। মন্দিরের বিশাল আঙিনাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে প্যান্ডেল। সেখানে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ১৬০টি দেব-দেবীর প্রতিমা। ইতিবাচক ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের গুণীজনদের ছবি ও বিভিন্ন উপদেশমূলক বাণী গাছ ও আশপাশের এলাকায় টানানো হয়েছে। এ কারণে প্রতিবছর পূজাকে ঘিরে কবুতরখালীর হালদার বাড়িটি দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণের জায়গায় পরিণত হয়।
আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এবার ভিন্ন ভিন্ন থিমে সাজানো হচ্ছে এই মন্দির প্রাঙ্গণ। মন্দিরে ১৬০টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রতিমার পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে নানা থিমের আয়োজন।
কবুতরখালীর হালদার বাড়িতে এই পূজার আয়োজন করছেন অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুদীপ কুমার হালদার এবং গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. স্নিগ্ধা চক্রবর্তী দম্পতি।

২০১০ সালে রাজমন্দিরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ২০১৬ সালে ৪০টি প্রতিমা দিয়ে এ পূজার আয়োজন শুরু করেন সুদীপ-স্নিগ্ধা দম্পতি। তারা পার্শ্ববর্তী মোড়েলগঞ্জের একটি বড় পূজা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের বাড়িতে এই আয়োজন শুরু করেন। এরপর প্রতিবছরই বেড়েছে আয়োজনের পরিসর। গত কয়েক বছরে প্রতিমার সংখ্যা তিন শতাধিক পর্যন্ত হয়েছিল।
আয়োজকেরা জানান, পূজায় শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, সামাজিক কার্যক্রমও থাকবে। দর্শনার্থী মায়েদের জন্য থাকবে ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার। সেখানে প্রতিদিন স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং অন্যান্য সমাজসেবামূলক কার্যক্রমও থাকবে।
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই মণ্ডপের বিশেষত্ব দেখতে আসছেন দর্শনার্থীরা। বরগুনা জেলা থেকে আসা তন্ময় মিত্র আনন্দ বলেন, ‘প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও এসেছি এখানের নতুন নতুন চিত্র দেখতে। এখানে প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রতিমার আয়োজন করা হয়। এ বছর নতুন যে আকর্ষণ ট্রাক ওঠার কাজ, এটা দেখার জন্যই আগে এসেছি। যা দেখলাম খুব ভালোই লাগল। পূজার সময় ফ্যামিলি নিয়ে আসব। এখানে পূজার সময় লক্ষ লক্ষ লোক হয়।’
প্রতিমা নির্মাণশিল্পী উজ্জ্বল বিশ্বাস গুরু বলেন, ‘মন্দিরে দুই বছর ধরে কাজ করি। চার থেকে পাঁচ মাসের পরিশ্রমে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করেছেন তারা। এত বড় আয়োজন তার জানা মতে আর কোথাও হচ্ছে না। বড় এই আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে তিনি আনন্দিত।’
রাজমন্দির কর্তৃপক্ষ ও সৈয়দ ফজলুল হক কলেজের সহকারী অধ্যাপক পলাশ চন্দ্র গাইন বলেন, ‘আমাদের এ বছর ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন হতে যাচ্ছে। দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে একটি মহামিলনের স্থান হচ্ছে এই রাজমন্দির। এখানে লাখো লাখো ভক্তের উপস্থিতি হয় এবং মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। গত বছরে নয়াদিল্লি, কলকাতা, জাপান, চীন, আমেরিকা ও ইংল্যান্ড থেকে পর্যটকরা এখানে এসে এই মন্দির সম্পর্কে নোটবুকে মন্তব্য করে গেছেন। এজন্য আমরা ধন্য। আয়োজক আমার দাদা এবং বৌদির প্রতি কৃতার্থ।’
রাজমন্দিরের সেক্রেটারি সুমন হালদার বলেন, ‘আমাদের এই পূজামণ্ডপ দক্ষিণাঞ্চলের তথা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্ববৃহৎ। এখানে পূজার এই পাঁচ দিনে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। এবারও আমরা সকলকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
আয়োজক ডা. সুদীপ কুমার হালদার বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম শ্রী শ্রী রাজমন্দিরের দুর্গাপূজার পক্ষ থেকে সবাইকে অগ্রিম শারদীয় শুভেচ্ছা। গত ১৬ বছর ধরে আমি এবং আমার স্ত্রী ডা. স্নিগ্ধা চক্রবর্তী দুজনে মিলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্রষ্টার পূজার মাধ্যমে তার সৃষ্টির পূজা করার জন্যই আমাদের এই মায়ের পূজা শুরু হয়। সেখান থেকে আজকের এই রাজমন্দির প্রতিষ্ঠিত। এবারের বিশেষত্ব ১৬০টি প্রতিমার সমন্বয় এবং প্রায় অর্ধেকের বেশি প্রতিমা ট্রাক ওঠার কাজের মাধ্যমে করা হয়েছে। গত ৬ মাস ধরে এ কাজ করা হচ্ছে। এখন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পূজার পাঁচদিন দুপুর ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত যত ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন, তাদের আমরা আহারের ব্যবস্থা করি। পাশাপাশি আমরা কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম করে থাকি। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের বাইর থেকেও পর্যটক আসেন এবং প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষের আগমন ঘটে।’
পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় শারদীয় উৎসব উপলক্ষে ইতিমধ্যে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এর বাইরেও পূজা চলাকালে আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা থাকবে। প্রতিটি মণ্ডপকে ঘিরে পৃথক নিরাপত্তা পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশের পোশাকের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নিরাপত্তার জন্য সদস্যরা মোতায়েন থাকবে। উৎসবমুখরভাবে যেভাবে পূজা উদযাপিত হয়, সেই লক্ষ্যে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’