হাজারো মোমবাতির আলোয় আলোকিত শেরপুরের গারো পাহাড়

হাজার হাজার মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে গারো পাহাড়। পাহাড়ি পথজুড়ে হাতে মোমবাতি নিয়ে প্রার্থনায় অংশ নেন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা। পরম ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর বারোমারী সাধু লিওর খ্রিষ্টান ধর্মপল্লীতে শেষ হয়েছে দু’দিনব্যাপী ২৮তম বার্ষিক তীর্থোৎসব। ‘মানবতার জননী; ফাতেমা রাণী মা মারীয়া’ মূলভাবকে সামনে রেখে আয়োজিত এ উৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে অর্ধলক্ষের বেশি তীর্থযাত্রী অংশ নেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে পুনর্মিলন সংস্কার ও বিকেলে পবিত্র খ্রীস্টযাগের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রাতে জপমালার প্রার্থনা, আলোক শোভাযাত্রা, সাক্রামেস্তের আরাধনা, নিরাময় অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রার্থনা ও নিশিজাগরণের মধ্য দিয়ে চলে প্রথম দিনের আয়োজন। শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথ অতিক্রম ও পবিত্র মহাখ্রীস্টযাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ২৮তম এই বার্ষিক তীর্থোৎসব।
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মনোরম আলোক শোভাযাত্রা। বৃহস্পতিবার রাতে রোমান ক্যাথলিক ভক্তরা হাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেড় কিলোমিটার পাহাড়ি ক্রুশের পথ অতিক্রম করেন এবং ৪৮ ফুট উঁচু মা মারীয়ার মূর্তির পাদদেশে প্রার্থনা ও মানত পূরণ করেন। এ সময় হাজারো মোমবাতির আলোয় ঝলমল করে ওঠে পুরো গারো পাহাড় এলাকা। তীর্থোৎসবকে কেন্দ্র করে ধর্মপল্লী এলাকায় নানা পণ্যের মেলা ও দোকানপাট বসে, যেখানে তীর্থযাত্রীদের পাশাপাশি স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষেরও সমাগম ঘটে।
তীর্থযাত্রীরা জানান, ফাতেমা রানি মা মারীয়ার প্রতি গভীর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থেকে প্রতিবছর তারা বারোমারীর এই তীর্থোৎসবে আসেন। কেউ আসেন পরিবারের মঙ্গল কামনায়, কেউ বা আসেন ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে মুক্তি ও মানসিক শান্তির আশায়। মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা এবং আলোক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে পাহাড়ি ক্রুশের পথ অতিক্রমের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটান। তাদের বিশ্বাস, মা মারীয়ার কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হবে এবং পরিবারে শান্তি ফিরে আসবে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভক্তদের কাছে এ উৎসব শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার এক বিশেষ মেলবন্ধন।
প্রথমবারের মতো আসা তীর্থযাত্রী রেবেকা বলেন, আমি এবারই প্রথম এসেছি। বন্ধুদের সাথে এসে খুব ভালো লাগছে, অনেকের সাথেই দেখা হচ্ছে। আমার মনের কিছু আকুতি আছে, তা মা মারীয়াকে জানাতেই এখানে এসেছি। শুধু আমি নই, মা মারীয়ার অসংখ্য ভক্ত এখানে এসেছেন।
আরেক তীর্থযাত্রী নয়োমি মাইকেল বলেন, আমি আগের বার মানত করেছিলাম, মা মারীয়া আমার সেই মানত পূরণ করেছেন। তাই এবার তাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছি। মূলত আমরা সুদৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই এখানে আসি। গতবার বন্ধুদের সাথে এলেও এবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, উৎসবকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। চার শতাধিক পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন ছিল। এছাড়া একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার, ফায়ার সার্ভিস, গ্রাম পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উৎসবটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই সাফল্য অর্জনে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবারই অবদান রয়েছে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, শেরপুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষ একাত্ম হয়। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান শেষ করতে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও আয়োজকদের যৌথ সমন্বয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেন পল কুবি বলেন, এ উৎসবের মাধ্যমে বিশ্বমানবতার কল্যাণ, শান্তি ও সম্প্রীতি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে। মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে এ ধরনের ধর্মীয় আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির প্রসারের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহারও বাড়ছে। তবে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কোনোভাবেই মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
১৯৪২ সালে ৪২ একর জমিতে ফাদার মার্কস বারোমারী মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালে ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশ এটিকে ‘ধর্মপল্লী’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে গড়ে তোলা হয় ‘ফাতেমা রানি মা মারীয়ার তীর্থস্থান’। প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এখানে রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের এই বার্ষিক তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
