বন্দিদের ‘ডাবল শাস্তি’: কারাগারে সাজা, বাইরে শব্দের যন্ত্রণা

রাত যত গভীর হয়, চারপাশের নীরবতায় তত তীব্র হয়ে ওঠে জেনারেটরের বিকট শব্দ। এভাবেই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা শব্দের যন্ত্রণায় কাটছে গাজীপুর জেলা কারাগারের বন্দিদের। কারাদণ্ডের সাজা শেষ হওয়ার অপেক্ষার পাশাপাশি প্রতিদিন তাদের গুনতে হচ্ছে এই শব্দদূষণের হিসাবও। বন্দিদের অভিযোগ, কারাগারে এমনিতেই মানসিক চাপ থাকে, তার ওপর নিরবচ্ছিন্ন এই শব্দ কেড়ে নিচ্ছে তাদের ঘুম ও স্বস্তি।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া কয়েকজন বন্দি জানান, কারাগারে থাকাকালে দিন-রাত অবিরাম যান্ত্রিক শব্দ শুনতে হতো তাদের। বিশেষ করে রাতে চারপাশের পরিবেশ যখন নীরব হয়ে যায়, তখন জেনারেটর ও বয়লারের শব্দ আরও তীব্র অনুভূত হয়। এতে অনেক বন্দি ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না। দীর্ঘ সময় ধরে এমন শব্দের মধ্যে থাকায় তীব্র মানসিক অস্বস্তি তৈরি হতো।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, পাশের আড়ং ডেইরি ফার্মের জেনারেটর ও বয়লার থেকে এই নিরবচ্ছিন্ন শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কারা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করেছে। পাশাপাশি গাজীপুরের জেলা প্রশাসককেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সরজমিনে গাজীপুর জেলা কারাগারে গিয়ে দেখা যায়, কারাগারের ঠিক পূর্ব পাশেই কারখানাটি অবস্থিত। কারাগার ও কারখানার মাঝখানে কয়েক ফুটের একটি সরু রাস্তা রয়েছে। ওই রাস্তায় দাঁড়ালে খুব একটা শব্দ শোনা না গেলেও বিশেষ অনুমতি নিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে বিকট শব্দ কানে আসে।
এ ছাড়া কারখানার ভবন থেকে কারাগারের ভেতরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়। কারাগারের পশ্চিম পাশের প্রতিটি সেলে অসহনীয় শব্দ ভেসে আসছে এবং কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়াও ভেতরে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে কারাগারের উত্তর-পশ্চিম কোণে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে একটি তিনতলা বাড়ি রয়েছে, যেখান থেকে কারাগারের ভেতরের সবকিছু দেখা যায়। এ ছাড়া পশ্চিম পাশে গ্রামীণফোনের একটি উঁচু টাওয়ার রয়েছে, যার ওপরে উঠলেও বন্দিদের গতিবিধি ও সব কার্যক্রম স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।
এ বিষয়ে এক বন্দি বলেন, আপনি দিনের বেলায় এসেছেন, তাতেই এমন শব্দ পাচ্ছেন। রাতের বেলা এই শব্দ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রাতে অন্যান্য শব্দ কমে গেলে জেনারেটরের বিকট শব্দে ঘুম আসে না।
রাহিম নামে এক কয়েদি বলেন, জেনারেটরের শব্দে আমাদের কানে সমস্যা হচ্ছে। ওই কারখানা থেকে বৃষ্টির মতো পানির ফোঁটা এসে পড়ে। আমরা কয়েদিরা সারাদিন কাজ শেষে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারি না এই শব্দের কারণে। আমরা চাই দ্রুত এই শব্দ বন্ধের ব্যবস্থা করা হোক।
কারা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, শব্দের মাত্রা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে কারাগারের স্বাভাবিক পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে বন্দিদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। একই সঙ্গে কারাগারের বিভিন্ন দাপ্তরিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনাতেও বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
গাজীপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, পাশে থাকা ডেইরি ফার্মের জেনারেটরের শব্দে বন্দি এবং কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই সমস্যায় পড়ছেন।
গাজীপুর জেলা কারাগারের জেলার নূর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, কারাগারের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে শব্দদূষণ থেকে মুক্তি প্রয়োজন। বিকট শব্দের কারণে বন্দিরা ঘুমাতে পারে না, আমাদেরও কাজ করতে সমস্যা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, কারাগারের পূর্ব পাশে একটি মিল্ক ফ্যাক্টরি রয়েছে, যার শব্দ ভেতরে প্রবেশ করায় ৫টি ইউনিটের বন্দিদের ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে। আমি বিষয়টি জানতে পেরে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি এবং দেখেছি যে শব্দটি আসলেই অসহনীয়। কারা বিধি ও জেল বিধি অনুযায়ী ভবন ও কারখানা নির্মাণের যে বিধান রয়েছে, তা অমান্য করা হয়েছে। উচ্চতা, দূরত্ব ও বিল্ডিং কোডের কোনো নিয়ম সেখানে মানা হয়নি। বিষয়টি লিখিতভাবে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনব।
তিনি আরও জানান, পশ্চিম পাশের দেয়াল ঘেঁষে গ্রামীণফোনের বিশাল একটি টাওয়ার রয়েছে, যা যেকোনো সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম কোণের দেয়াল ঘেঁষা তিনতলা ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ। এই তিনটি বিষয়ই কারাগারকে নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিষয়গুলো নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হবে।




