-75852e-720x405.webp)
মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, নিয়মিত অভিযান এবং আইনগত ব্যবস্থার ঘোষণা কোনোটিই যেন পুরোপুরি থামাতে পারছে না মাদারীপুরের শিবচরের পদ্মা নদীতে ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। নদীঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল ও বিভিন্ন ঘাটে গড়ে উঠেছে ইলিশের অস্থায়ী হাট। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব হাটে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে সদ্য ধরা ইলিশ, যার মধ্যে রয়েছে ডিমওয়ালা মা ইলিশও। অন্যদিকে পদ্মার তাজা মাছ তুলনামূলক কম দামে পাওয়ার আশায় প্রতিদিন এসব বাজারে ভিড় করছেন ক্রেতারা।
স্থানীয় কয়েকজন জানান , ইলিশের চাহিদা, বাজারে ভালো দাম এবং অধিক লাভের আশায় একশ্রেণির জেলে, মৌসুমি মাছ শিকারি ও ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সক্রিয় রয়েছেন। নদী থেকে ট্রলারে করে মাছ এনে কোথাও সরাসরি বিক্রি করা হচ্ছে, কোথাও জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে খুচরা বাজার বসাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। মাছের হাট ঘিরে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট ও খাবারের দোকান। ফলে একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে এসব হাটকে কেন্দ্র করে সাময়িকভাবে জমে উঠছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য।
চরাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে অস্থায়ী হাট
শিবচর উপজেলার মাদবরেরচর, চরজানাজাত, বন্দরখোলা ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের পদ্মাতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কাজিরসূরা, হীরাখাঁর বাজার ও বাংলাবাজারসহ পাঁচ থেকে সাতটি স্থানে প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে মাছ কেনাবেচা।
সম্প্রতি মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা এলাকায় পদ্মার পাড়ে একটি অস্থায়ী ইলিশের হাট ঘুরে দেখা যায়, বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে এসে ভিড়ছে। জেলেরা ঝুড়ি ও ডালিভর্তি মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে নামছেন। কেউ কেউ ঘাটে পৌঁছানোর আগেই ট্রলারে থাকা অবস্থায় পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন। পরে সেই মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে বসছেন খুচরা বিক্রেতারা। ক্রেতারা দরদাম করে পছন্দের ইলিশ কিনে নিচ্ছেন।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। শিবচরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের স্থান থেকে মানুষ আসছেন মাছ কিনতে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসছেন, কেউ আবার একাধিক ব্যাগে মাছ কিনে বাড়ি ফিরছেন।
ইলিশের হাট ঘিরে নদীর পাড়ে বসেছে খাবারের দোকানও। মাছ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে আশপাশের অস্থায়ী দোকানগুলোতে জমে উঠেছে বেচাকেনা। তবে বাজারের এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালেই মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কম দামে তাজা মাছের টানে ক্রেতারা
ক্রেতাদের কাছে পদ্মার তাজা ইলিশের আকর্ষণ অনেক বেশি। বাজারদরের তুলনায় কম দামে মাছ পাওয়ার প্রত্যাশাও তাদের এসব অস্থায়ী হাটে টানছে। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ কেনাবেচা অব্যাহত থাকলে অবৈধ শিকারিরা উৎসাহিত হতে পারেন বলে মনে করছেন স্থানীয়দের অনেকে।
পরিবার-পরিজন নিয়ে মাছ কিনতে আসা মো. আকাশ মিয়া বলেন, ‘এ সময় মাছের দাম কমে পাওয়া যায়। এছাড়া পদ্মা থেকে ধরা একদম তাজা মাছ সবার কাছেই লোভনীয়। আসলে আমি না কিনলেও কেউ না কেউ তো কিনবেই, তাহলে সমস্যা কোথায়?’
কাঁঠালবাড়ির পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় গিয়েও দেখা যায়, নদী পার হয়ে ট্রলারে করে চরাঞ্চলের হীরাখাঁর চরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন নারী-পুরুষ। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাদের অনেকেই মাছ কেনার উদ্দেশ্যে সেখানে জড়ো হয়েছেন।
সেখানে হাফিজা আক্তার নামের এক নারী বলেন, ‘এত কষ্ট করে মাছ কিনতে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এখন তাজা-টাটকা মাছ পাওয়া যায়। আবার এ মাছগুলো পদ্মা নদীর। বছরের বেশিরভাগ সময় তো আমরাও পদ্মা নদীর তাজা ইলিশ পাই না। তবে প্রশাসন মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত করে।’
মৌসুমি জেলে ও ব্যবসায়ীদের তৎপরতা
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ শিকারে যুক্ত ব্যক্তিদের সবাই পেশাদার জেলে নন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মৌসুমি জেলে ও ব্যবসায়ীরাও। বছরের অন্য সময়ে নিয়মিত ইলিশ শিকার না করলেও এ সময়ে মাছের প্রাপ্যতা ও বিক্রির সুযোগ কাজে লাগাতে কেউ কেউ নৌকা, ট্রলার ও জাল সংগ্রহ করে নদীতে নামছেন।
মৌসুমি জেলে ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘সারা বছর পদ্মা নদীতে তেমন ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। এ সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, তবে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

মৌসুমি ব্যবসায়ী জালাল মিয়া বলেন, ‘আমরা সুযোগ পেলে জেলেদের কাছ থেকে এই ২২ দিন মাছ কিনে বিক্রি করি। অন্য সময়ের চেয়ে এ সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, আবার বিক্রিও বেশি হয়।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইলিশের চাহিদা ও লাভের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞার সময়েও একটি চক্র সক্রিয় থাকে। কোথাও জেলেরা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে মাছ বিক্রি করছেন, আবার কোথাও আলাদা ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করছেন। এতে মাছ ধরা থেকে শুরু করে দ্রুত বাজারজাত করা পর্যন্ত একটি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বলে তাদের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দাদনের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে মাছের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন কিছু ব্যবসায়ীও। ফলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ শিকার ও বিক্রির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভিযানের আগেই সতর্ক হয়ে যায় বিক্রেতারা
দুর্গম চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমিত জনবল এবং মাছ শিকার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তৎপরতা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, শিবচরের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রশাসনের কোনো দল চরাঞ্চলের দিকে রওনা হলে অনেক সময় আগেই খবর পৌঁছে যায় অস্থায়ী হাটের বিক্রেতাদের কাছে। তখন তারা কাশবনসহ বিভিন্ন আড়ালস্থানে সরে যান। কেউ আশ্রয় নেন দুর্গম চরে, আবার নদীর পাড়ে থাকা জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাঝনদীতে চলে যান। ফলে অভিযান পরিচালনা করেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতেনাতে আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে পদ্মা নদীর শিবচর অংশের বিভিন্ন স্থানে মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশের একাধিক দল নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদী থেকে ১০ জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর আগেও আটক ব্যক্তিদের জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ অবৈধ জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ ছাড়া বুধবার কাজিরসূরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্থায়ী মাছের বাজার ভেঙে দেওয়া হয়। তবে অভিযান শেষে বিভিন্ন স্থানে আবারও মাছ শিকার ও বেচাকেনা শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পরও নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ আহরণ ও বাজারজাতকরণ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
জনবলসংকটের কথা জানাল মৎস্য বিভাগ
শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, সরকার ঘোষিত ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে উপজেলা মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশের সমন্বয়ে পদ্মা নদীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ যাতে ইলিশ শিকার, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি করতে না পারে, সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু জেলে নদীতে জাল ফেলছেন এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছেন। এসব অনিয়ম বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পদ্মা নদীতে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে জনবলসংকট রয়েছে। দক্ষ জনবলের অভাবের পাশাপাশি ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় অভিযান পরিচালনার জন্য বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। মৎস্য বিভাগ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নৌপুলিশের সমন্বয়ে অভিযান চালানো হলেও নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা ও দুর্গম চরাঞ্চলে সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চরজানাজাত নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নাছিম আহমেদ জানান, ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মৎস্য কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া মা ইলিশ রক্ষায় সকাল ও রাতে নদীতে নৌপুলিশের দুটি টহল দল দায়িত্ব পালন করে।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান জানান, ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের নির্দেশনা ও প্রচলিত আইন মেনে চলতে সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছে। আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ আহরণ, অবৈধ জাল ব্যবহার কিংবা সংরক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করা হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু নদীতে অভিযান পরিচালনা করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীতে মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি মাছ পরিবহন, মজুত, পাইকারি কেনাবেচা এবং খুচরা বাজারের ওপরও সমান গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। নিষিদ্ধ সময়ে মাছের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

